উৎসবের সাফে ভোগান্তির মহোৎসব

উৎসবের সাফে ভোগান্তির মহোৎসব

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ মানেই উৎসব, উন্মাদনা আর ফুটবলপ্রেমীদের মিলনমেলা। ২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৮- তিনবারই এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ফুটবলপ্রেমীদের উৎসবে মাতিয়েছিল বাংলাদেশ। এবারের চিত্রটা ভিন্ন। ঘরের মাঠে সাফের আসর বসেছে ঠিকই, কিন্তু নেই উৎসবের আমেজ, নেই দর্শকদের উন্মাদনা। বরং উদ্বোধনের দিনেই সামনে এসেছে অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা আর নানা ভোগান্তির চিত্র। সাফে অংশ নিতে আসা দল, সমর্থক থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মী- কাউকেই যেন স্বস্তি দিতে পারেনি আয়োজকরা। এত ভোগান্তির সাফ আগে দেখেছেন কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক জাহিদ হাসান এমিলির চোখেও এবারের সাফ একেবারেই নিষ্প্রাণ। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে দেশে ও বিদেশে একাধিক সাফ খেলেছি। কোনো সাফই এরকম নিষ্প্রাণ লাগেনি। হামজা (চৌধুরী) বাংলাদেশের হয়ে খেলছে, ফুটবলে নতুন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। তার ওপর সাফ হচ্ছে ঢাকায়। সব মিলিয়ে এটা একটা বড় উৎসব হতে পারতো। কিন্তু এর কিছুই নেই।’ শুধু মাঠের বাইরের আয়োজন নয়, টুর্নামেন্টের সূচি ও টিকিটের দাম নিয়েও অসন্তোষ দর্শকদের। বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থক মেহেদী হাসান মনে করেন, স্বাগতিক দেশের দর্শকদের কথা বিবেচনায় নিয়েই সূচি করা উচিত ছিল। তার প্রশ্ন, ‘বাংলাদেশ সাফের স্বাগতিক, অথচ শুক্র-শনিবার কোনো ম্যাচ নেই। যে দিনগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস ছুটি থাকে।

আবার বাংলাদেশের ম্যাচগুলো রাত ৮টায়। এত রাতে খেলা দেখে দর্শকদের বাড়ি ফিরে পরদিন সকালে অফিস, স্কুল-কলেজে যাওয়া কঠিন। এর পাশাপাশি ১ হাজার টাকা দামের অতিমূল্যের টিকিট তো আছেই।’ সাধারণত কোনো টুর্নামেন্টের স্বাগতিক দেশ আয়োজন সফল করতে নানা প্রচার-প্রচারণা, দর্শক সম্পৃক্ততা ও আনুষঙ্গিক কর্মসূচি হাতে নেয়। এবার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) স্বাগতিক হলেও সাফ ঘিরে তাদের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই বললেই চলে। আয়োজনের বড় অংশের দায়িত্ব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান টিএসএর হাতে। কিন্তু তাদের ব্যবস্থাপনাতেও দেখা যাচ্ছে একের পর এক অসংগতি। অন্যদিকে, সাফের পক্ষ থেকেও কার্যকর সমন্বয় ও উদ্যোগের ঘাটতি চোখে পড়ছে। টুর্নামেন্টের উদ্বোধন দিনেও দেখা মেলেনি ট্রফির। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা জানিয়েছিল টিএসএ। প্রথম দুই ম্যাচের মাঝে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও সেটি কীভাবে, কতক্ষণ ধরে এবং কী আয়োজনের মধ্য দিয়ে হবে, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য ছিলো না। একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের উদ্বোধন ঘিরে এমন অনিশ্চয়তা আয়োজকদের প্রস্তুতি নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। সাফকে বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম। অথচ এবার সাংবাদিকদেরও পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আগেরদিন ভারতের অনুশীলন কাভার করতে পারেননি বাংলাদেশি সাংবাদিকরা। স্বাগতিক দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ভারতীয় দলের ম্যানেজমেন্টের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। হোটেলের ছোট একটি কক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড সংগ্রহ করতেও সাংবাদিকদের পোহাতে হয়েছে নানা ঝক্কি। অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পাওয়ার পরও স্বস্তি মেলেনি। প্রেস বক্সে প্রবেশের জন্য নিতে হয়েছে আলাদা পাস। বিকেল সাড়ে ৩টায় খেলা শুরু হলেও সেই পাস সংগ্রহের জন্য দুপুরেই হাজির হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। পাস বিতরণের সময় ও সংখ্যা নিয়েও ছিল অসন্তোষ। মাঠে ফুটবলের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হামজা চৌধুরীর উপস্থিতি, ঘরের মাঠে খেলা এবং দীর্ঘদিন পর সাফ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন-সব মিলিয়ে এবারের আসর বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পারতো। কিন্তু আয়োজনের শুরুতেই সেই সম্ভাবনায় জল ঢেলেছে অব্যবস্থাপনা। যে সাফ ঘিরে উৎসবের অপেক্ষায় ছিল ফুটবলপ্রেমীরা, উদ্বোধনের দিনেই তা পরিণত হয়েছে ভোগান্তির গল্পে।