প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শ্রমিকদের দাবির আড়ালে সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নেড়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো শ্রমজীবী মানুষ বা শ্রমিক ভাই-বোন কখনো নিজেদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করতে পারেন না। অথচ একটি মহল বিভিন্ন কলকারখানায় গিয়ে ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাটের খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত পথসভায় প্রধানমন্ত্রী এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘গত ৫০ বছরে দেশে যে শিল্পকারখানাগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলো বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ মা-বোন ও শ্রমজীবী মানুষ কাজ করেন। এই শিল্পকারখানাগুলো দেশের সম্পদ, মানুষের সম্পদ।’
‘বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখেছি, উচ্ছৃঙ্খল কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন কলকারখানায় গিয়ে ভাঙচুর করছে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চেষ্টা চালাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, কোনো শ্রমজীবী ভাই-বোন কিংবা শ্রমিক কখনো শিল্পের ক্ষতি করতে পারেন না’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘একটি মহল গত ১৫-১৬ বছরে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেনি। তারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল এবং দেশের মানুষের অর্থ-সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, তারাই এখন সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়ছে এবং দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমিক ভাই- বোনদের মজুরি নিয়ে কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে, সরকার সে বিষয়ে অবগত। তাদের দাবিগুলো বিবেচনা ও পর্যালোচনার জন্য ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ড কাজও শুরু করেছে। ইনশাআল্লাহ্, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে, যাতে শ্রমিক ভাই-বোনেরা ভালো থাকতে পারেন।
বাগেরহাট জেলা বিএনপি’র নেতা ব্যারিস্টার জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে পথসভায় উপস্থিত ছিলেন- নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজীব আহসান, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, জেলা বিএনপি নেতা সোমনাথ দে, কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা।
পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী হযরত খানজাহান আলী (রহ:)-এর মাজার জিয়ারত করেন। সেখানে তিনি দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর বিকালে প্রধানমন্ত্রী খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭ (সিজন-২)’-এর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাংলাদেশ তোমাদের। তোমাদেরই দেশটিকে গড়ে তুলতে হবে। তোমরা প্রত্যেকে একেকজন বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব তোমাদের নিতে হবে।’
তারেক রহমান বলেন, কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি কিংবা আইনজীবী হবে। কিন্তু শুধু লেখাপড়া করলেই চলবে না। প্রত্যেককে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতেও পারদর্শী হতে হবে। কারণ, বিশ্বকে জয় করতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রেও নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরে ১৬ লাখ শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রতিভার অভাব নেই। তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ দায়িত্ব সরকারের। সরকার এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে শিশুরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও শিল্প-সংস্কৃতিতে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারে। শিশুদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ছয়-সাতটি বিদেশি ভাষার মধ্য থেকে পছন্দমতো একটি শেখার সুযোগ তৈরির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং তৃতীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বিশ্বের কোনো জাতিই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে পিছিয়ে রাখতে পারবে না।
তিনি বলেন, এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যে দেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে অন্য কোনো দেশের নাম নিতে হবে না। বরং বাংলাদেশই হবে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দেশের উদাহরণ। নতুন প্রজন্মকে সেই অবস্থানে দেশকে নিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যতে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ ও সংস্কৃতিচর্চার মঞ্চে আবার দেখা হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের দর্শক গ্যালারির উপস্থিত শিশু-কিশোরদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন- যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন- মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান। এর আগে বাগেরহাট থেকে খুলনায় আসার পথে রূপসার কুদির বটতলায় পথসভায় বক্তব্য রাখেন। খুলনা প্রবেশের সময় রূপসা উপজেলার তিলক কুদির বটতলায় প্রটোকল ভেঙে মিশলেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। হাত মেলালেন সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে।
খুলনা মহানগরীতে প্রবেশ করে ডাকবাংলা মোড়ে আয়োজিত পৃথক পথসভায় বক্তব্য দেন। এখানে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য ফ্যাসিবাদের আমলে বন্ধ হওয়া সকল মিল-কারখানা চালু করা হবে। খুলনার হারানো ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা হবে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনের পরিচালনায় পথসভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি সহ মহানগর নেতৃবৃন্দ। বিকাল তিনটা ৪২ মিনিটে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— লেখা বাসটি জেলা স্টেডিয়ামের সামনে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী সার্কিট হাউজে না গিয়ে সেখানেই নেমে পড়েন। তখন সার্কিট হাউজে অপেক্ষমাণ যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যরা দ্রুত স্টেডিয়ামে যান। এর আগে সকালে তিনি মোংলা, বাগেরহাটে কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।
