আয়োজনের বেহাল দশা, দায় নিচ্ছে বাফুফে-সাফ

আয়োজনের বেহাল দশা, দায় নিচ্ছে বাফুফে-সাফ

ফন্ট সাইজ:

টুর্নামেন্ট শুরু আজ। প্রথম দিনে বিকাল সাড়ে তিনটায় মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। রাতে স্বাগতিক বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভুটান। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা ঘিরে ঢাকায় থাকার কথা ছিল উৎসবের আমেজ। শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল ফুটবল উন্মাদনা। অথচ বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই। চোখে পড়ার মতো প্রচারণা নেই, নেই উৎসবের আবহ, নেই আয়োজনে পেশাদারত্বের ছাপ। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা আর একের পর এক বিতর্কে ম্লান হয়ে পড়েছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয়, আয়োজনের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই দায় নিতে চাইছে না কেউ।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) যেন একে অন্যের কোর্টে বল ঠেলে দায়মুক্তি খুঁজছে। বিদেশি দলগুলোর অভিযোগ, হোটেল ব্যবস্থাপনায় বিপত্তি, টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য এবং প্রচার-প্রচারণায় ঘাটতি- সব মিলিয়ে আয়োজকদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে ভারতীয় দলের হোটেল বরাদ্দ নিয়ে ঘটে গেছে চরম অব্যবস্থাপনার ঘটনা। অন্য দলগুলোর মধ্যেও আয়োজন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। অথচ এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর সমন্বয়ের বদলে চলছে বাফুফে ও সাফের দায় ঠেলাঠেলি। বাফুফের দাবি, এবারের টুর্নামেন্টের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সাফের। অন্যদিকে সাফের অভিযোগ, আয়োজক হিসেবে বাফুফের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মিলছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ঢাকায় সাফ আয়োজনের দায়িত্ব আসলে কার হাতে?
স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাফুফেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে সাফ।

চুক্তি অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে ঢাকায় আয়োজনের বিভিন্ন কাজে বাফুফের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করার কথা সাফের। অর্থাৎ দায়িত্ব বণ্টন থাকলেও বাস্তবে দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপালেও শেষ পর্যন্ত এর দায় নিতে হচ্ছে বাংলাদেশকেই। অথচ অতীতে তিনবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ। ২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৮ সালের আসরগুলোতে ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন। ঢাকার রাস্তায় শোভা পেতো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা ও ফুটবলারদের ছবি। প্রচারণায় থাকতো উৎসবের আমেজ। এবার সেই চেনা দৃশ্য উধাও। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেও বাফুফের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। হয়নি ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠান। গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হলেও সেখানেও ছিল বিশৃঙ্খলা। একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের উদ্বোধনের আগের দিনও যখন আয়োজনের এমন হাল, তখন প্রস্তুতির মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

সমন্বয়হীনতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারতীয় দলের হোটেল বিড়ম্বনা। মঙ্গলবার ঢাকায় এসে ভারতীয় ফুটবলাররা জানতে পারেন, তাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে কোনো কক্ষই বরাদ্দ নেই। হোটেলে পৌঁছেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় তাদের। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা একটি দলের আবাসন নিশ্চিত করতে না পারা আয়োজকদের চরম অপেশাদারত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। বিষয়টি নিয়ে ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের বক্তব্যেও দায় এড়ানোর সুর। তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা সাফ করছে। স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাফুফে তাদের সহায়তা করছে। এখনো কোনো বিরোধ বা দূরত্ব নেই।’ অপরদিকে সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন জানিয়েছেন পুরো ইভেন্ট তারা ছেড়ে দিয়েছেন একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির হাতে।

তিনি বলেন, ‘বাফুফের সহযোগিতা নিয়ে তাদের পুরো বিষয়টি দেখভাল করার কথা। সেখানে বাফুফে কতোটুকু সহযোগিতা করছে, তা আপনারাই ভালো বলতে পারবেন।’ টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান টিএসএ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট। সাফের মতো আঞ্চলিক পর্যায়ের বড় টুর্নামেন্ট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্ব দেয়ার পেছনে বাফুফের একজন সহসভাপতি ও একজন সদস্যের ভূমিকা রয়েছে। ফলে দায়িত্ব বণ্টন ও প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের প্রক্রিয়াও সামনে এসেছে আলোচনায়। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) জাহেদ পারভেজ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দিন শেষে সাফ হচ্ছে বাংলাদেশে। এখানে বিদেশি দলগুলো যদি অব্যবস্থাপনার শিকার হয়, দিন শেষে আমাদেরই বদনাম হবে। তখন কেউ সাফকে দোষ দেবে না। এ কারণেই বাফুফের উচিত সাফের সঙ্গে সমন্বয় করে টুর্নামেন্টটি যাতে সফল হয়, সেদিকে নজর দেয়া।’ টুর্নামেন্টের মাঠের লড়াইয়ে কারা জিতবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মাঠের বাইরের আয়োজনের দায় নিয়ে দুই সংস্থার এই টানাপড়েন চলতে থাকলে সাফের সাফল্যের চেয়ে বাংলাদেশের সাংগঠনিক ব্যর্থতাই বেশি আলোচিত হবে।