দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা নিরসন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের প্রতি ১৪ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্র্নিধারণ করে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকরের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় তারা পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। এ অবস্থায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ যৌক্তিক দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে।
আতিকুর রহমান বলেন, সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ডকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দিতে হবে। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত নতুন মজুরি ঘোষণা করতে হবে।
শিল্পকারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উৎপাদন ব্যাহত করার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে কারখানা ধ্বংস হলে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারাবেন, মালিকেরা বিনিয়োগ হারাবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি। এসব ঘটনার পেছনে নিষিদ্ধ স্বৈরাচারী সংগঠন কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানান তিনি।
গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভে হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করে আতিকুর রহমান বলেন, গত ৩ নভেম্বর মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে তৌফিক শেখ (২১) নামে এক পোশাকশ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং মিথ্যা মামলা বন্ধের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিজিএমইএর হিসাবে নভেম্বরের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে ৫০০ থেকে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। বুধবার দুপুর ১টা পর্যন্ত ৩০৬টি কারখানা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে গাজীপুরে ১৬১টি, আশুলিয়ায় ৯৩টি এবং মিরপুরে ৫২টি। এতে প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। সিপিডির তথ্য উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৫৭টি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আতিকুর রহমান বলেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য রপ্তানিতে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিক ও মালিককে মুখোমুখি না দাঁড় করিয়ে আলোচনা, আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংকটের সমাধান করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ১৪ দফা দাবির মধ্যে রয়েছেÑপোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্র্নিধারণ ও ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা, তৌফিক শেখ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তি, আহতদের সুচিকিৎসা, নাশকতা ও সহিংসতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ, নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তি এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত, শ্রমিক-মালিক ও সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ, বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া, বেআইনি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের কাজে ফেরার সুযোগ, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।
সমাপনী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব নয়, আবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিম, সহসভাপতি হারুনুর রশিদ খান ও কবির আহমদ, সহসাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম ও মাওলানা মহিবুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
