সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে শাস্তি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটি বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কিংবা কারও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে শাস্তি দেয়া হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতার লঙ্ঘন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের বরখাস্ত, সাময়িক বহিষ্কার এবং পাঠদানে বিধিনিষেধ আরোপের মতো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
এসব পদক্ষেপের পেছনে অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তারা হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংসতায় সহযোগিতা করেছেন, দলটির পক্ষে ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কিংবা ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থক বলে অভিযোগ থাকা শত শত শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এমন বিতর্কে ভয় পাওয়ার কথা কেবল স্বৈরশাসকদের, ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত কোনো সরকারের নয়। অতীতের দমন-পীড়নের অধ্যায় পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার বদলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের আচরণ পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, তারা এক ডজনের বেশি ভুক্তভোগী শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠিপত্র, টেলিভিশনে প্রচারিত একটি আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পর্যালোচনা করেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারে বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেয়ার বিষয়ও উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এইচআরডব্লিউকে বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন না করা আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এখন যা ঘটছে তা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ এবং ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন না করা শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে টার্গেট করছে। আমাদের ক্লাস নিতে দেয়া হচ্ছে না, গবেষণা করতে পারছি না, কিছুই করতে পারছি না।’
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলন দমনে পুলিশের নৃশংস অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। ওই আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় ফেরে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা অতীতেও ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্তৃপক্ষ ৪৪ জন শিক্ষককে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়। স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য শৃঙ্খলামূলক তদন্ত ছাড়াই এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এইচআরডব্লিউ। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছয় শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আরও ১৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের তদন্ত শুরু হয়েছে।
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘তদন্ত কমিশন’ গঠনের পর ১২ জন শিক্ষককে বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। আরও ৩৪ জনের পদাবনতি করা হয় অথবা তাদের কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনস্বীকৃত শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া মেনে নেয়া হয়েছে বলে মনে হয়নি।
ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের পর ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্তের শুনানিতে তাদের অংশ নিতে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া আরও ৮৫ জন শিক্ষককে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সব মিলিয়ে ২০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১২৬ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে এবং তাদের পরীক্ষার সনদ আটকে রাখে।
কমিটির দাবি ছিল, এসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার ছবি, ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগপন্থি আরও ২৭৭ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে মামলা করা হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তারা ক্যাম্পাসে আসছেন না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের অনেকেই সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অভিযোগের জবাব দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সুযোগ দেয়নি।
শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান। ২০১৭ সাল থেকে তিনি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর একটি হলো, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করে একে ‘অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলেছিলেন। তবে এইচআরডব্লিউ ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও পর্যালোচনা করে এমন কোনো মন্তব্যের প্রমাণ পায়নি।
আরেকটি অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এক বৈঠকে তিনি ‘গণহত্যায় উসকানি’ দিয়েছিলেন। তবে ওই বৈঠকটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আয়োজন করেছিল এবং সব উপাচার্যের জন্য এতে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
মশিউর রহমান এইচআরডব্লিউকে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ তাকে দেখানো হয়নি। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্থায়ীভাবে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগপন্থি একটি মিছিলে অংশ নেয়া। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার এক দিন আগে ওই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মিছিলটিকে ‘সন্ত্রাসী’ মিছিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও এইচআরডব্লিউ বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যায়, একদল মানুষ ক্যাম্পাসে স্লোগান দিতে দিতে হাঁটছেন। তবে ভিডিওতে সরাসরি কোনো সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট ওই মিছিলে ‘স্লোগান দেয়ার’ অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তিনি ‘ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নিপীড়ন, নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতি সমর্থন’ জানিয়েছেন। তবে এইচআরডব্লিউ পর্যালোচিত ভিডিওতে তাকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারকেও ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্যাম্পাসে শেখ হাসিনার ‘গণহত্যার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান’ নিয়েছিলেন।
তবে ইয়াহিয়া খন্দকার বলেছেন, পুরো আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন না। হাইকোর্ট তার বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
এদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিন শিক্ষাবিদের দণ্ড হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন কারাগারে রয়েছেন। আরেকজনের বিচার এখনো বাকি।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, আগের সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করার কারণে কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা প্রমাণ করবে যে বাংলাদেশে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারবেন; যে জায়গায় দিনের ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সমর্থন চাপিয়ে দেয়া হবে, তা নয়।
