ট্রাম্পের ভুলে নজিরবিহীন পরাজয়, সামনে আরও বড় বিপদ

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের ভুলে নজিরবিহীন পরাজয়, সামনে আরও বড় বিপদ

ফন্ট সাইজ:

আধুনিক মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গণপ্রত্যাখ্যানগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক বিজয়কে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা, ইরানে অজনপ্রিয় যুদ্ধ, জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং মুখোশধারী এজেন্টদের অভিবাসী ধরপাকড়-সবকিছুর বিরুদ্ধে রায় দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মার্কিন ভোটাররা।
তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের হাতে। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও নীল ঢেউ আছড়ে পড়ে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে মার্কিন সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

ডেমোক্র্যাটদের বিজয় এতটাই ব্যাপক ও দ্রুত ছিল যে, ট্রাম্পের নির্বাচনে পরাজিত হলে কারচুপির অভিযোগ তোলার প্রবণতাও এবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে প্রশাসনের যে সম্ভাব্য অভিযান নিয়ে আশঙ্কা ছিল, তা বাস্তবে দেখা যায়নি।
২০২০ সালের নির্বাচনের কলঙ্কজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবার ঘটবে না। কারণ, ডেমোক্র্যাটদের বিজয় এত বড় যে তা কারচুপির মাধ্যমে উল্টে দেয়ার সুযোগ নেই। ট্রাম্পের দুই মেয়াদে চরম চাপের মুখে পড়া মার্কিন গণতন্ত্র এবার তার শাসনামল পার করে টিকে থাকার সম্ভাবনা দেখছে।
রিপাবলিকানদের বিপর্যয় প্রকাশ্যে আসার পর গণমাধ্যমে ফোন করে কথা বলার সময় ট্রাম্পকে অনেকটা নমনীয়, অনুতপ্ত ও আগের চেহারার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ মনে হয়েছে।

নির্বাচনের একদিন আগে নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো’ ঘোষণা করা প্রেসিডেন্ট এমনকি সম্প্রতি যাদের তিনি আমেরিকার অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
পলিটিকোর নির্বাচনী রাতের সরাসরি সম্প্রচারে তিনি বলেন, ‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব, যাতে আমাদের দেশের জন্য সবকিছু ভালোভাবে এগিয়ে যায়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
ট্রাম্প এদিন দাবি করার চেষ্টা করেছেন, রিপাবলিকান প্রার্থীরা মূলত তার মতো না হওয়ার কারণেই হেরে গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা এড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল না।

নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে ভুল হিসাব করেছিলেন ট্রাম্প
নির্বাচনকে ট্রাম্প নিজের ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত করেছিলেন। অথচ তার জনপ্রিয়তা ছিল ভয়াবহভাবে নিম্নমুখী। এ বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম-বিশেষ করে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক ছিল। এতে লাখ লাখ মার্কিন পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিজের স্বার্থপর রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের ভুল হিসাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশকে ‘স্বর্ণযুগে’ নিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত-এমন আত্মতুষ্টিমূলক বক্তব্যও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের পরাজিত করতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্র্নিধারণের মাধ্যমে রাজনৈতিক মানচিত্র নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেই উদ্যোগের বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছে। বরং ট্রাম্পের ব্যাপক অজনপ্রিয়তার কারণে রিপাবলিকানরাই একের পর এক আসন হারিয়েছেন।

পরাজয়ের দায় কার, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে ধারাবাহিক নয়, বিরতিসহ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছর পর নিজের আদলে গড়ে তোলা রিপাবলিকান পার্টির এমন বিপর্যয়কে তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় পতন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
মঙ্গলবার নির্বাচনী রাত যত এগিয়েছে, ততই রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমে ধীরগতিতে শুরু হলেও পরে অবিশ্বাস্য এক ধারায় ডেমোক্র্যাটদের বিজয় ছড়িয়ে পড়ে। তারা প্রতিনিধি পরিষদে জয় পায়, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো অভাবনীয় জায়গায় সিনেটে বড় সাফল্য অর্জন করে এবং একাধিক গভর্নর পদও নিজেদের দখলে নেয়।
ট্রাম্প যেসব প্রার্থীকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে জোর করে সামনে এনেছিলেন, তাদের অধিকাংশই ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন এবং দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর ডারলিন গ্রাহাম, যিনি তার প্রয়াত ভাইয়ের আসন ধরে রাখতে পারেননি।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল যদি মাগা মতাদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে সিনেটর জোনি আর্নস্ট ও থম টিলিসকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা না করত, তাহলে রিপাবলিকানরা হয়তো আইওয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনার আসনগুলো ধরে রাখতে পারত।
সিএনএনের জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নীতি, অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান এবং নেতৃত্বের বিরোধিতা করছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে তাকে প্রজন্মের অন্যতম অসাধারণ রাজনৈতিক তারকা হিসেবে তুলে ধরেছে। রিপাবলিকান দলের তৃণমূলের মনোভাব বুঝতে তার প্রায় অতিপ্রাকৃত দক্ষতা রয়েছে এবং প্রচলিত ধারার কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে অসম্ভব রাজনৈতিক বিজয়ও তিনি এনে দিতে পারেন-এমন প্রচার চালানো হয়েছে।
এ দাবির কিছু সত্যতা রয়েছে। কিন্তু ১০ বছর আগে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিস্ময়কর বিজয়ের পর মঙ্গলবার সেই ক্ষমতা যেন ট্রাম্পকে ছেড়ে গেছে। দেশের সবচেয়ে কট্টর রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোতে দলকে রক্ষা করতে টানা এক মাসের প্রচেষ্টাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

সামনে আরও রাজনৈতিক অস্থিরতা
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে? আগামী বছর নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, ইরান যুদ্ধ, হোয়াইট হাউসের দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্ষমতায় আসার পর প্রায় দুই বছরে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়েছে-এমন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়েও ধারাবাহিক তদন্ত শুরু হতে পারে। এতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনদের ওপর চাপ বাড়বে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা এসেছে। ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে নতুন নিয়োগ আটকে দেয়ার ক্ষমতা থাকবে তাদের হাতে। একইভাবে দলের বিরোধিতা রয়েছে-এমন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ অনুমোদন না দেয়ার সুযোগও পাবে তারা।

এখন যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র দলীয় সংঘাতের সময় শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনী ধাক্কায় ট্রাম্প আহত হলেও কার্যত তিনি এখন ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট। তবে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টিকারী এই প্রেসিডেন্টকে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে দেখা যাবে, এমনটা মনে হয় না।
দেশটিতে বাজেট নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেয়ার আগে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ শেষ করতে না পারলে এ যুদ্ধ নিয়েও সংঘাত তীব্র হতে পারে। নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশ পরিচালনার চেষ্টাকে ঘিরে সাংবিধানিক বিরোধ এবং ট্রাম্পের সহযোগীদের সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করতে ডেমোক্র্যাটদের জারি করা সমন নিয়েও দীর্ঘ লড়াইয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিদেশের মাটিতে ট্রাম্প আরও খামখেয়ালি ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন। মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের ব্যাপকতা-যেখানে ডেমোক্র্যাটরা তাদের কল্পনার চেয়েও বেশি আসনে জয় পেয়েছেন-২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে থাকা নেতাদের জন্যও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখন বড় সমস্যায় পড়েছেন। এত দিন তাকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এখন তাকে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের স্বার্থে ধীরে ধীরে ট্রাম্পের প্রভাব থেকে দূরত্ব তৈরির কঠিন কাজ শুরু করতে হতে পারে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কি মাগা-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে পারবেন, যেখানে পুরোনো রিপাবলিকান পার্টির অবশিষ্ট শক্তিগুলোও যুক্ত হবে? একসময় তিনিও ছিলেন সেই দলের প্রভাবশালী নেতা। নাকি ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতো অন্য নেতারা মনে করবেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতার দায়মুক্ত কোনো প্রার্থীই আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার এবং রিপাবলিকানদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের ভালো সুযোগ পাবেন?
অন্যদিকে, বিজয়ের উৎসব শেষ হলে ডেমোক্র্যাটদের সামনেও কঠিন বাস্তবতা হাজির হবে। তারা ক্ষমতার একটি বড় অংশ পেলেও ভোটারদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনার মতো পূর্ণ ক্ষমতা পাবে না। কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে থাকবে বিল আটকে দেয়ার ভেটো ক্ষমতা।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা ব্যর্থ হলে-যে ক্ষেত্রে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ট্রাম্প দুজনই ব্যর্থ হয়েছেন-মাত্র দুই বছর পর পরবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরাও বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে পারেন।