যুদ্ধ, সাইবার হামলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় বিঘ্নের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। এ লক্ষ্যে খাবার, পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ, যোগাযোগের সরঞ্জাম এবং জরুরি সামগ্রী ঘরে প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইউরোপীয় সিভিল প্রোটেকশন ফোরামে জনসাধারণের নতুন প্রস্তুতিবিষয়ক নির্দেশিকা উপস্থাপন করেন ইউরোপীয় কমিশনার ফর ইকুয়ালিটি, প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট হাদজা লাহবিব। ইউরোপে ক্রমবর্ধমান ও জটিল সংকট মোকাবিলায় নাগরিক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তুতি বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ইউরোপীয় কমিশনের নাগরিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তাবিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কোনো বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে প্রথম কয়েক দিন জরুরি উদ্ধার ও সরকারি সহায়তা পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এ সময় নাগরিকদের যেন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা থাকে, সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকায় চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি পরিস্থিতির প্রথম ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা তৈরি, শিশুদের বয়সোপযোগীভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার শিক্ষা দেওয়া, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি পরিকল্পনা তৈরি এবং সংকটের সময় নাগরিকদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া।
তবে ইউরোপীয় কমিশনের এই নির্দেশিকা কোনো বাধ্যতামূলক সরকারি আদেশ নয়। একইভাবে এটি ইউরোপে আগামী তিন দিনের মধ্যে যুদ্ধ, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের পূর্বাভাসও নয়। বরং সম্ভাব্য বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
ফ্রান্সে আগে থেকেই ৭২ ঘণ্টার জরুরি কিটের পরামর্শ
ইউরোপীয় কমিশনের নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি ফ্রান্সেও নাগরিকদের জন্য ৭২ ঘণ্টার জরুরি কিট প্রস্তুত রাখার সরকারি পরামর্শ রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সুরক্ষা বিভাগ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বড় ধরনের দুর্যোগে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফরাসি সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ছয় লিটার পানীয় জল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ও রান্না ছাড়াই খাওয়া যায় এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ব্যাটারিচালিত রেডিও, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, মোবাইল ফোনের চার্জার, নগদ অর্থ এবং পরিচয়পত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি জরুরি কিটে রাখা উচিত।
এ ছাড়া অতিরিক্ত চাবি, গরম পোশাক, জরুরি কম্বল এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং পোষা প্রাণী রয়েছে এমন পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ জরুরি কিটটি সহজে পাওয়া যায় এমন শুকনো ও নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি বছরে অন্তত একবার খাবার ও ওষুধের মেয়াদ এবং ব্যাটারির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।
২০২৭ সাল থেকে ইউরোপীয় প্রস্তুতি দিবস
নাগরিকদের মধ্যে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ইউরোপীয় প্রস্তুতি দিবস আয়োজনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে ইউরোপীয় কমিশন। ২০২৭ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর একই দিনে এটি আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তুতি ইউনিয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে গৃহীত এই কৌশলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ইউরোপের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের বার্তা হলো, জরুরি পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। ঘরে পর্যাপ্ত খাবার, পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকলে বড় কোনো সংকটের প্রথম ৭২ ঘণ্টা পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
