২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০ কোটি রুপি নগদ খরচ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ভারতের নাগপুর থেকে অতিথিদের সেখানে নেয়া হয়েছিল ব্যক্তিগত বিমানে। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের জন্য উড়িয়ে নেয়া হয়েছিল তারকাদেরও। তদন্তকারীদের কাছে এখন সেই বিয়েটিই ভারতের অন্যতম বৃহৎ কথিত অনলাইন জুয়া কেলেঙ্কারির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। এ নিয়ে দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, তদন্তকারীরা বর সৌরভ চন্দ্রকরকে ওমান থেকে ভারতে ফিরিয়ে এনেছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)। তিনি ‘মহাদেব অনলাইন বুক’ নেটওয়ার্কের প্রধান উদ্যোক্তা। আর্থিক অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) দায়ের করা মামলায় তাকে এক নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ট্রানজিট রিমান্ডের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। এরপর তাকে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে একটি বিশেষ আদালতে হাজির করার কথা।
সিবিআইয়ের দায়ের করা দুটি এবং ইডির দায়ের করা একটি মামলায় চন্দ্রকরকে খুঁজছিল তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তিনটি মামলাতেই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। ইন্টারপোলের ‘রেড কর্নার নোটিশ’ জারির পর ওমানের রয়্যাল পুলিশ তাকে আটক করে। এরপর ভারত তার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করে। ছত্তিশগড় সরকারের অনুরোধে মামলাটি হাতে নেয় সিবিআই। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তদন্তে দেখা গেছে, জুয়ার অর্থ একাধিক স্তরের ‘মিউল’ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হতো। পরে হাওলা নেটওয়ার্কের সাহায্যে তা বিদেশে পাঠানো হতো।
এই অর্থের একটি অংশ কথিতভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও ব্যবহার করা হয়েছিল। ইডির দাবি, ছত্তিশগড়ের ভিলাইয়ের বাসিন্দা চন্দ্রকর ও রবি উপ্পল যৌথভাবে এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। শুরুতে তারা ছোট পরিসরে ব্যবসা করতেন। তবে ২০১৯ ও ২০২০ সালের দিকে তাদের বেটিং ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। করোনা মহামারির সময় মানুষ ঘরে বন্দি থাকায় এবং অনলাইন কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় নেটওয়ার্কটির বিস্তার আরও বাড়ে। পরে দুজনই দুবাই চলে যান এবং সেখান থেকে ভারতে কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সংস্থাটির ভাষ্য, দুবাইয়ের সদর দপ্তর থেকে ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ব্যবহারকারীর আইডি, বেটিংয়ের অর্থ এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থাকা স্থানীয় পরিচালন ইউনিট বা ‘প্যানেল’ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ভারতে ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকি ফ্র্যাঞ্চাইজি ও প্যানেল অপারেটরদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। তবে সফটওয়্যার, ব্যবহারকারী, হিসাব-নিকাশ ও রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ উদ্যোক্তাদের হাতেই ছিল। ইডির দাবি, তদন্তে ৩ হাজার ২০০টির বেশি প্যানেল ও শাখার সন্ধান পাওয়া গেছে। একটি প্যানেল কিনতে অপারেটরকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ রুপি দিতে হতো। এরপর তাকে ব্যাংক হিসাব, ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ও কর্মী সংগ্রহ করতে হতো। সদর দপ্তর থেকে দেয়া হতো ‘মাস্টার আইডি’ ও লগইন তথ্য। সেগুলো ব্যবহার করে অপারেটর গ্রাহকদের বেটিং আইডি দিতেন। অপারেটররা নিজেদের অধীনে ‘সাব-প্যানেল’ও তৈরি করতে পারতেন। কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিক প্যানেল পরিচালনা করতেন। সংস্থাটির মতে, মুনাফার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সদর দপ্তরে চলে যেত। কিছু প্যানেলে অবশিষ্ট অর্থ অপারেটর ও স্থানীয় ব্যবস্থাপকের মধ্যে ভাগ করা হতো।
ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হতো। বড় অনুষ্ঠান, তারকাদের প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি দেখিয়েও নেটওয়ার্কটির প্রচার চালানো হতো বলে দাবি করেছে ইডি। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা দর্শকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দেয়া হতো, যার মাধ্যমে তারা প্যানেল অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। গ্রাহকরা ১০০ রুপি জমা দিয়ে শুরু করতে পারতেন। এরপর তাদের দেয়া হতো ইউজার আইডি ও বেটিং ক্রেডিট। তারা ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, তাসের খেলা ও অন্যান্য খেলায় বাজি ধরতে পারতেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, কোনো গ্রাহক বড় অঙ্কের অর্থ জিতলে তার আইডি বন্ধ করে দেয়া হতো অথবা অর্থ পরিশোধে বাধা দেয়া হতো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যানেলগুলো প্রতি সপ্তাহে সদর দপ্তরে হিসাব জমা দিত। প্রতি সোমবার অর্থের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতো। কোনো প্যানেল অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তার লগইন সুবিধা বাতিল করা হতো।
ইডির দাবি, দুবাইয়ের প্রধান কল সেন্টারে প্রায় এক হাজার ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপ অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। ‘চেকার’ নামে পরিচিত একটি দল ১২ ঘণ্টার শিফটে হিসাব, প্যানেল ও অর্থ পরিশোধের বিষয়গুলো নজরদারি করত। কর্মীদের অনেকেই ছত্তিশগড় ও ভিলাইয়ের তরুণ। তাদের ভাড়া করা ভিলায় রাখা হতো। তাদের আবাসন, খাবার ও দৈনন্দিন খরচের হিসাবও সংরক্ষণ করা হতো।
ইডির হিসাবে, ‘মহাদেব অনলাইন বুক’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেটিংয়ের পরিমাণ ৭৫ হাজার কোটি থেকে ৮০ হাজার কোটি রুপি। ‘স্কাইএক্সচেঞ্জ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ১১ হাজার কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি রুপি এবং ‘লোটাস৩৬৫’-এর মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি রুপি বেটিং হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। সব মিলিয়ে নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর আনুমানিক লেনদেন দাঁড়ায় ৮৮ হাজার কোটি থেকে ৯৪ হাজার কোটি রুপি। সংস্থাটির অভিযোগ, ৪ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি রুপি ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ১১৬ জনকে আসামি করে ছয়টি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪ জনকে।
ইডির দাবি, বেটিংয়ের অর্থ সরাসরি উদ্যোক্তাদের কাছে যেত না। বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাবের মধ্য দিয়ে তা স্থানান্তর করা হতো। এসব হিসাবের অনেকগুলো এমন ব্যক্তিদের নামে খোলা হয়েছিল, যাদের সঙ্গে বেটিংয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিছু হিসাব ভাড়া নেয়া হতো। কিছু হিসাবধারী নিজেদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে কমিশন পেতেন। আবার কারও কারও অজান্তে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের নথিপত্র ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তদন্তকারীরা এসব হিসাবকে ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ বলে অভিহিত করেন। অর্থের উৎস ও চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে আড়াল করতে এসব হিসাবের মধ্যে বারবার অর্থ স্থানান্তর করা হতো। পরে তা বিভিন্ন কোম্পানি ও শেল ফার্মের মাধ্যমে ঘোরানো হতো। শেল ফার্ম বলতে এমন প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যেগুলোর মূলত কাগজে-কলমে অস্তিত্ব থাকে।
মোবাইল ফোনের দোকান, ছোট কোম্পানি ও অন্যান্য ব্যবসার মাধ্যমে নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঢোকানো হতো। অন্যদের হয়ে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার জন্য কিছু অপারেটর এক থেকে দুই শতাংশ কমিশন নিতেন বলে অভিযোগ। একটি ঘটনায়, হানি সিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে ২০১৯ সালের মে থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪৮ লাখ রুপি জমা হয়েছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাবার একটি পেমেন্ট ব্যাংক হিসাবও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ইডির ভাষ্য, নাভি মুম্বইয়ে প্রায় ৮৮৬টি মিউল অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৮৪ কোটি রুপির লেনদেন হয়েছে। রায়পুরে পাওয়া গেছে ৪৩১টি হিসাব।
প্রথম দিকে ব্যাংক ও কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠানো হতো। আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ার পর ২০২৩ সালে হাওলার ব্যবহার বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে ইডি। হাওলা হলো অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা। এতে এক দেশে নগদ অর্থ দেয়া হয় এবং অন্য দেশে সমপরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়। ব্যাংকের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তর করতে হয় না। দাম্মানি ভাইয়েরা এই ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ। প্রতি এক লাখ রুপি স্থানান্তরের জন্য তারা প্রায় ১০০ রুপি কমিশন নিতেন। ইডির দাবি, এসব লেনদেনের নথি প্রতিদিন ধ্বংস করা হতো।
অর্থের নিষ্পত্তি ভ্রমণ বুকিংয়ের মাধ্যমেও করা হতো বলে অভিযোগ। ইডির দাবি, ভুপালের ‘র্যাপিড ট্রাভেলস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্যানেল অপারেটরদের কাছ থেকে নগদ অর্থ সংগ্রহ করে দুবাইভিত্তিক উদ্যোক্তাদের ভ্রমণ ও হোটেলের খরচ পরিশোধ করত। প্রতিষ্ঠানটির নথিতে ‘এমডি দুবাই’ ও ‘এমডি কেনিয়া’ নামে লেনদেনের উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে। ইডির হিসাবে, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টিকিট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৫৫ কোটি রুপি। এশিয়ার বিভিন্ন শেল কোম্পানিকে প্রায় ৩০০ কোটি রুপির পণ্য পরিবহন বা ফ্রেইট বাবদ অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের সন্দেহ, প্রকৃত অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগীদের আড়াল করতেই এসব লেনদেন করা হয়েছিল। বেটিংয়ের অর্থ দিয়ে দুবাইয়ে বিলাসবহুল ভিলা, জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হয়েছিল বলেও অভিযোগ। এসব সম্পত্তির অনেকগুলো সহযোগী, আত্মীয়স্বজন ও কোম্পানির নামে কেনা হয়। অর্থ স্থানান্তরের আরেকটি পথ ছিল বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারী (এফপিআই) চ্যানেল।
বিয়ের খরচের হিসাব: ইডির দাবি, বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য হাওলার মাধ্যমে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে প্রায় ১১২ কোটি রুপি পাঠানো হয়েছিল। হোটেল বুকিংয়ে নগদ খরচ হয়েছিল প্রায় ৪২ কোটি রুপি। সংস্থাটি জানিয়েছে, একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে বিয়ের খরচের একটি নথি উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১১২ কোটি ৫ লাখ রুপির ব্যয়ের হিসাব ছিল। নগদ অর্থ পরিশোধের নথিও পাওয়া গেছে। অতিথিদের তালিকা ‘টিম’, ‘ব্যবসা’ ও ‘বন্ধু’- এমন বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। অনুষ্ঠান আয়োজকদের ওপর অভিযান চালিয়ে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাওলা অপারেটরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ সময় হিসাববহির্ভূত প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ রুপি নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দুবাইয়ে আয়োজিত একটি বড় অনুষ্ঠানের কথাও উল্লেখ করেছে ইডি। ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুবাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আরেকটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ইডির হস্তক্ষেপের পর সেটি বাতিল হয়। সংস্থাটির মতে, এসব অনুষ্ঠান নেটওয়ার্কের প্রচার, নতুন গ্রাহক ও প্যানেল অপারেটর আকৃষ্ট করার কাজে ব্যবহার করা হতো।
