রিমান্ডে যে তথ্য দিলো দীপ-তিশা

সিসিটিভিতে তিন সন্দেহভাজন নারী

রিমান্ডে যে তথ্য দিলো দীপ-তিশা

ফন্ট সাইজ:

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় রিমান্ডে থাকা তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপ ও বান্ধবী জেরিকা তাসনীম দিশার বক্তব্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য ওঠে এসেছে। একই সঙ্গে টঙ্গী মাজার বস্তির তুরাগ তীরের মাঠের এক সিসি ক্যামেরায় সন্দেহভাজন তিন নারীর উপস্থিতি দেখা গেছে। ওই রাতে ওই নারীদের সঙ্গেও তাহসিফের দেখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই রাতে তাহসিফের সঙ্গে ঠিক কি হয়েছিল তার অনেকটাই জানেন ওই তিন নারী। তাদের আইনের আওতায় আনলে প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হতে পারে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ২৭শে অক্টোবর নিখোঁজের আগে রাত ১টার দিকে টঙ্গী মাজার বস্তির দোকানের সামনে তাহসিফ ও দীপ রাস্তায় মোটরসাইকেল পার্ক করে বস্তির একটি গলির মধ্যে দিয়ে তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যাচ্ছে। ওই সময়ে তিন মহিলা তাদের যেতে নিষেধ করছেন। বলছেন-এই তোমরা চলে যাও। ওইদিকে যাইয়ো না। রেইড চলে। তবে তখন তাহসিফ ইংরেজিতে দীপকে বলছেন, ‘ডোন্ট টক টু মাচ, জাস্ট ওয়াক’। তখন ওই নারীদের পাশ থেকে কয়েকজন পুরুষ বলে- যাক, গিয়ে বারি (মাইর) খেয়ে আসুক। আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ মাঠের মধ্যে এক নারীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তখনো তাহসিফ স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে ওই মহিলার সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলেন তাহসিফ।

ওই সময় তাহসিফের কিছুটা পেছনেই হেলমেট হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীপ। আর ঠিক দীপের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরও দুই নারী। অন্ধকারে তাহসিফ হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে গেলে দীপ তার হাতের ফোনের টর্চলাইট জ্বালিয়ে তাহসিফের পেছন পেছন চলা শুরু করেন। ওই সময়ে পেছন থেকে ওই দুই নারী এসে সিসি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তাহসিফের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছু সময় পরই রাত ১টা ১৪ মিনিটের দিকে ৮ সদস্যের পুলিশের একটি টিম নিয়মিত টহলের জন্য মাঠে প্রবেশ করে। এর ৬ মিনিট পর দীপকে দেখা যায় হেলমেট হাতে একা একা মাজার বস্তির রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। দেড়টার দিকে নিজের মোটরসাইকেল চালিয়ে মাজার বস্তি থেকে বের হয়ে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিজ বাসায় চলে যান দীপ। পরদিনই ওই তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ।

এদিকে টঙ্গী নৌ-পুলিশের কাছে ৪ দিনের রিমান্ডে থাকা তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু দীপ বলেছেন, ২৭শে অক্টোবর রাতে বান্ধবী জেরিকা তাসনীম দিশার সঙ্গে সোনারগাঁ জনপথের পাশের নেস্টবারে মদ্যপ অবস্থায় বিরোধের পর হেরোইন কিনতেই টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন তাহসিফ।

দীপের বরাত দিয়ে মামলাটির তদন্তকারী টঙ্গী নৌ-পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নিহত তাহসিফের বান্ধবী দিশা কিছুদিন আগে অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ওই যুবকের সঙ্গে দিশার শারীরিক সম্পর্কও হয়। আর এই পুরো বিষয়টি জেনে যান তাহসিফ। এরই প্রেক্ষিতে ২৭শে অক্টোবর দিশাকে ফোন করে দেখা করতে বলেন তাহসিফ। এরপর তাকে নিয়ে নেস্টবারে যান। বারে প্রবেশের পর তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে স্যাড সং বাজাতে বলেন। এরপর বারের ওয়েটাররা তাদের পানীয় পরিবেশন করেন। ওই সময়ে তাহসিফ ১৬% অ্যালকোহলের তিনটা বিয়ার পান করেন। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক তারা দুজনে মদ পান করেন। তাদের সঙ্গে দীপও মদ পান করেন। মদ্যপানের এক পর্যায়ে তাহসিফ অন্য এক যুবকের সঙ্গে ইয়াবা সেবন এবং তার সঙ্গে রাত কাটানোর বিষয়ে দিশাকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বেশ ঝগড়াও হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ দিশাকে বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছো, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাবো। আমি হেরোইন খাবো।’ এরপর তারা তিনজনই বার থেকে বের হয়ে যান।

বিষয়টি নিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন বলেন, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তার বক্তব্য যাচাই বাছাই করা হয়েছে। তাহসিফের লাশে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারে গিয়েও যাচাই বাছাই করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

‘পুলিশ মাঠে প্রবেশ করে ১টা ১৪ মিনিটে আর তাহসিফ তার মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠান রাত দেড়টায়, এটা কীভাবে সম্ভব’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু দীপ ও দিশা রিমান্ডে রয়েছেন, তাই তাদের এ বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপরও তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তে জানা যাবে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তিনি মাদক সেবন করেছিলেন কিনা কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কিনা, সেসব বিষয়ও জানা যাবে।