যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার (৩রা নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচন শুরু হয়েছে। আগামী দুই বছরের জন্য দেশটির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে এ নির্বাচনে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি ক্ষমতাসীন অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, নাকি বিরোধী ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে-এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এ ছাড়া এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্বও।
নির্বাচনে ভোট দেয়ার যোগ্য মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটির ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ২৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার নাগরিক ভোট দেয়ার যোগ্য। এরই মধ্যে ৫ কোটি ৩৬ লাখের বেশি আমেরিকান আগাম ভোট দিয়েছেন। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন গবেষণাগারের তথ্যের বরাতে এ হিসাব জানিয়েছে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম।
কাদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে এই নির্বাচনে?: এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবক’টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ কক্ষের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। দুই বছর পরপর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-উভয় কক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ফেডারেল নির্বাচনের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর ও রাজ্য পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের গভর্নর নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এ নির্বাচন ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি দুই বছরের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তার দলের প্রতি জনগণের সমর্থন-অসন্তুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়।
জরিপে এগিয়ে বিরোধীরা: এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয়ের প্রত্যাশা করছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। বিভিন্ন জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় উল্লেখযোগ্য পতনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডেমোক্রেটদের তিনটি আসনে নিট অগ্রগতি প্রয়োজন। সামপ্রতিক জনমত জরিপগুলোতে এ লক্ষ্য অর্জনে দলটির সম্ভাবনা উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। বর্তমানে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে রিপাবলিকানরা। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্রেটদের অন্তত চারটি আসনে নিট অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি অঙ্গরাজ্যে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ জনমত জরিপে ডেমোক্রেট প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। অঙ্গরাজ্যগুলো হলো-আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, মিশিগান, ওহাইও ও টেক্সাস।
জনমত জরিপ কতোটা নির্ভরযোগ্য: জনমত জরিপে ডেমোক্রেটদের এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেলেও এ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের সামপ্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
২০১৬ ও ২০২৪ সালে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথে জরিপের পূর্বাভাসের তুলনায় ভালো ফল করেছিলেন ট্রাম্প। ২০২০ সালের নির্বাচনে তার সামান্য ব্যবধানে পরাজয়ের আগেও অধিকাংশ জরিপে ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেনের বড় জয়ের আভাস দেয়া হয়েছিল। ফলে এবারের জরিপে ডেমোক্রেটদের এগিয়ে থাকার অর্থ এই নয় যে, নির্বাচনে তাদের জয় নিশ্চিত।
ডেমোক্রেটরা জিতলে ট্রাম্পের পরিণতি কী হবে?: ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ট্রাম্পের জন্য কংগ্রেসে নিজের রাজনৈতিক ও নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে বাজেট, সরকারি ব্যয়, অভিবাসন-নীতি, শুল্ক আরোপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি।
এ ছাড়া কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্রেটরা বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্তের সুযোগ পাবেন। প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ, সরকারি অর্থের ব্যবহার, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই’র (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শুরু হতে পারে। প্রয়োজনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তলব, নথিপত্র চাওয়া এবং শুনানির আয়োজন করতে পারবেন কংগ্রেসের কমিটিগুলো।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের নীতিগত কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুল্ক, অভিবাসন, আবাসন ও সরকারি ব্যয়ের মতো বিষয়ে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার আইনি সুযোগ খতিয়ে দেখছেন হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা।
এরই মধ্যে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটরা জয়ী হয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিলে তাদের আনা বিলগুলোতে একের পর এক ভেটো দেবেন। নিউ ইয়র্ক পোস্টের সাংবাদিক মিরান্ডা ডিভাইনের পডকাস্ট ‘পড ফোর্স ওয়ান’-এ দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তিনি ‘মিস্টার ভেটো’ হয়ে উঠবেন। তাদের পাঠানো সব বিলে ভেটো দিয়ে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করবেন।
কখন জানা যাবে ফল?: যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই আসতে শুরু করবে প্রাথমিক ফল। বাংলাদেশ সময় বুধবার (৪ঠা নভেম্বর) ভোর থেকে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ফল জানা যেতে পারে। অঙ্গরাজ্যভেদে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার সময় আলাদা হওয়ায় ফল প্রকাশের সময়ও এক হবে না।
বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টার দিকে প্রথম দফার ফল আসতে শুরু করতে পারে। সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের ফল পাওয়া যাবে। এরপর ধীরে ধীরে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসনগুলোর চিত্র স্পষ্ট হতে থাকবে। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোর ফল চূড়ান্ত হতে কয়েকদিনও লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঙ্গরাজ্যে ভোটের ব্যবধান খুব কম হলে ভোট গণনা ও পুনর্গণনার কারণে ফল ঘোষণায় বিলম্ব হতে পারে। ফলে বুধবার সকাল থেকে রাতের মধ্যে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে।
