মেট্রোরেল আধুনিক, মানুষ কতটা মানবিক?

ইউরোপের চিঠি

মেট্রোরেল আধুনিক, মানুষ কতটা মানবিক?

ফন্ট সাইজ:

মেট্রোরেল ছুটছে আধুনিকতার গতিতে, কিন্তু সেই গতির সঙ্গে কি এগোচ্ছে আমাদের মানবিকতা? অসুস্থ হয়ে একটু বসার জায়গা চেয়েও না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনেও এক কঠিন প্রশ্ন। ইউরোপে প্রায় এক দশক বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বারবার মনে হয়, সভ্যতার পরিচয় বড় বড় স্থাপনায় নয়, বরং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই নির্মমভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে তার ছেলে নাকিবুর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠান শেষে শাহবাগ থেকে মেট্রোরেলে ওঠার পর তার বাবা অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। তিনি আশপাশের যাত্রীদের কাছে বসার জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, কেউ তাকে বসার সুযোগ করে দেননি। একপর্যায়ে তিনি ট্রেনের মেঝেতে পড়ে যান। পরে উত্তরা উত্তর স্টেশনে তাকে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: শুধু একটি আসন না পাওয়াই তার মৃত্যুর কারণ ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো চিকিৎসাগত তথ্য আমাদের হাতে নেই। সময়মতো চিকিৎসা পেলে তিনি বেঁচে যেতেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু তার অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর আশপাশের মানুষ কতটা সাড়া দিয়েছিলেন, জরুরি সহায়তা কত দ্রুত পাওয়া গিয়েছিল এবং গণপরিবহনে অসুস্থ যাত্রীর জন্য কী ব্যবস্থা থাকা উচিত, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
কারণ, একটি মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো একটি সমাজের বিবেকের সামনে আয়না তুলে ধরে। ইউরোপে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, গণপরিবহনে প্রবীণ, অসুস্থ, গর্ভবতী নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাসে বা ট্রেনে সংরক্ষিত আসন থাকে। প্রয়োজন হলে অন্য যাত্রীকে আসন ছেড়ে দিতে অনুরোধ করা হয়। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য প্রবেশপথ, নির্দিষ্ট জায়গা এবং ওঠানামার সুবিধা রাখার চেষ্টা করা হয়।

ফ্রান্সে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকার কার্ডের মাধ্যমে গণপরিবহনে আসন ও অপেক্ষার সারিতে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশটির সরকারি তথ্যসেবায় এ অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যেও বাসে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকার আসন রাখার নিয়ম রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আইন ও পরিবহনবিধিতে গণপরিবহন ব্যবহারে সমান সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রবেশগম্যতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যসূত্র: ফ্রান্সের সরকারি সেবাবিষয়ক পোর্টাল, যুক্তরাজ্য সরকারের পরিবহন নির্দেশিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রানজিট প্রশাসনের বিধিবিধান।
তবে ইউরোপ বা আমেরিকাকে স্বর্গ ভাবার কোনো কারণ নেই। সেখানেও নিয়ম ভাঙা হয়, অসহযোগিতা দেখা যায়, প্রতিবন্ধী যাত্রীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সব যাত্রী সব সময় মানবিক আচরণ করেন, এমন দাবিও বাস্তবসম্মত নয়। দেশভেদে নিয়ম, প্রয়োগ ও নাগরিক আচরণে পার্থক্য আছে।

তবু যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, মানবিক আচরণকে সেখানে শুধু ব্যক্তিগত দয়া হিসেবে দেখা হয় না; অনেক ক্ষেত্রে এটি অধিকার, দায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অংশ। বাংলাদেশে আমাদের ঘাটতিটা ঠিক এখানেই।
আমরা অনেক সময় প্রবীণ কাউকে আসন ছেড়ে দেওয়াকে ব্যক্তিগত মহানুভবতা মনে করি। অথচ একজন অসুস্থ মানুষকে বসতে দেওয়া, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে লিফটে ওঠার জায়গা করে দেওয়া কিংবা গর্ভবতী নারীকে ভিড়ের মধ্যে নিরাপদে দাঁড়াতে সাহায্য করা নিছক অনুগ্রহ নয়। এগুলো দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের পরিচয়।
একবার ভেবে দেখুন, সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত একজন তরুণ বাসে বসে আছেন। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন একজন বৃদ্ধ, যার হাঁটুতে ব্যথা। পাশেই হয়তো একজন গর্ভবতী নারী, কিংবা এমন কেউ যার শারীরিক অসুস্থতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
তরুণটির ক্লান্তি বাস্তব। তারও বিশ্রামের প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু একজন অপেক্ষাকৃত সক্ষম মানুষের কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার অসুবিধা আর একজন অসুস্থ মানুষের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কি সব সময় সমান? না, সমান নয়।

এই উপলব্ধিটুকু তৈরি হওয়া দরকার। কে কতটা কষ্টে আছেন, তা সব সময় চোখে দেখা যায় না। কারও হাতে লাঠি নেই বলে তিনি সুস্থ, কারও চেহারায় অসুস্থতার ছাপ নেই বলে তার বসার প্রয়োজন নেই, এমন ধারণা বিপজ্জনক।
ড. নাজিবুর রহমানের ঘটনায় তার ছেলের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি কয়েক মিনিট ধরে অসুস্থ বোধ করছিলেন, ঘামছিলেন এবং বসতে চেয়েছিলেন। আশপাশের যাত্রীরা যদি এসব লক্ষণ বুঝে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কেউ কেন সক্রিয়ভাবে সাহায্যের উদ্যোগ নিলেন না?

তবে পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া প্রত্যেক যাত্রীর আচরণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। ভিড়ের মধ্যে কেউ হয়তো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি, কেউ হয়তো ভেবেছেন অন্য কেউ সাহায্য করবেন। কিন্তু ঠিক এই মানসিকতাই বিপদের সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে পরিচিত একটি ধারণা হলো নুংঃধহফবৎ বভভবপঃÑঅনেক মানুষ কোনো বিপদের সাক্ষী হলে প্রত্যেকে অন্য কারও উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। এটি প্রতিটি ঘটনার ব্যাখ্যা নয়, কিন্তু আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: বিপদে কাউকে দেখলে শুধু তাকিয়ে না থেকে নির্দিষ্টভাবে সাহায্যের উদ্যোগ নিতে হবে।
একজন বলবেন, ‘আপনি বসুন।’ আরেকজন মেট্রোরেলকর্মীকে খবর দেবেন। অন্য কেউ জরুরি সেবায় ফোন করবেন। দায়িত্ব ভাগ হয়ে গেলে সাহায্য দ্রুত পৌঁছাতে পারে।

সম্প্রতি মেট্রোরেল স্টেশনের একটি ভিডিও নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে থাকা এক ব্যক্তি লিফটে ওঠার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ভেতরে সক্ষম যাত্রীদের ভিড়ে তার ওঠার জায়গা হচ্ছে না। পাশে থাকা ব্যক্তি তাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে সুযোগ দিতে অনুরোধ করেন। জবাবে লিফটে থাকা কয়েকজনকে অপেক্ষা করতে বলার কথা বলতে শোনা যায়।
ভিডিওটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে একটি ভিডিওর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নিয়েও বলা যায়, দৃশ্যটি আমাদের অগ্রাধিকারের ধারণা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

যিনি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারেন, তার জন্য সিঁড়ি একটি বিকল্প। কিন্তু হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য লিফট অনেক সময় চলাচলের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। দুজনের প্রয়োজন তাই এক নয়। এই পার্থক্য বোঝাই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রথম শর্ত।
অন্তর্ভুক্তি মানে সবাইকে একইভাবে দেখা নয়; বরং কার কী প্রয়োজন, তা বুঝে সবার চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করা। একটি লিফটে ‘প্রবীণ, অসুস্থ, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের অগ্রাধিকার’ লেখা থাকলে সেটি নিছক সাজসজ্জা নয়। সেই নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগও প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণপরিবহনে সমান সুযোগ দেওয়ার জন্য অসবৎরপধহং রিঃয উরংধনরষরঃরবং অপঃ বা অউঅ-র অধীনে বিভিন্ন বিধান রয়েছে। যুক্তরাজ্যে বাসে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের অগ্রাধিকার আসন এবং প্রবেশগম্যতার বিষয়ে সরকারি নিয়ম আছে। ফ্রান্সেও নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য গণপরিবহনে অগ্রাধিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু আইনের উল্লেখ করলেই বাস্তবতা বদলে যায় না। আইন কার্যকর করতে হয়, মানুষকে নিয়ম জানাতে হয়, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হয় এবং নিয়ম ভাঙলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশের মেট্রোরেলেও প্রয়োজন একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ।

প্রথমত, প্রতিটি ট্রেন ও স্টেশনে জরুরি চিকিৎসাসহায়তা চাওয়ার সহজ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে কোথায় খবর দিতে হবে, কীভাবে কর্মীদের দ্রুত পাওয়া যাবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? এসব তথ্য স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেলকর্মীদের জরুরি পরিস্থিতি শনাক্ত করা, দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সমন্বয়ের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুধু স্টেশনে নিরাপত্তাকর্মী থাকলেই হবে না; তাদের দায়িত্ব ও সাড়া দেওয়ার প্রক্রিয়াও কার্যকর হতে হবে।
তৃতীয়ত, অগ্রাধিকার আসন ও লিফট ব্যবহারের নিয়ম শুধু লিখে রাখলে চলবে না। নিয়মিত ঘোষণা, প্রচারাভিযান এবং প্রয়োজনে কর্মীদের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কোনো যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কীভাবে নিরাপদে সহায়তা করতে হবে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। স্ট্রোক বা অন্য কোনো গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে অনুমান করে বসে না থেকে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা চাওয়া উচিত। কাউকে জোর করে পানি খাওয়ানো বা অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে সরানোও ঠিক নয়।

বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সহায়তা চাওয়া যায়। এমন নম্বর সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং গণপরিবহনে জরুরি যোগাযোগের প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন।
ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করা আরও সহজ। কিন্তু আমরা কি শুধু অন্যদের দোষ দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে পারি?
যে যাত্রী আসন ছাড়েননি, তার আচরণ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, একজন যাত্রী গুরুতর অসুস্থ হলে ট্রেনের কর্মীদের কাছে দ্রুত খবর পৌঁছানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? জরুরি চিকিৎসাসহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত? স্টেশনগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা কীভাবে এমন পরিস্থিতি সামলান? যাত্রীদের মধ্যে জরুরি সহায়তা দেওয়ার ন্যূনতম সচেতনতা তৈরিতে কর্তৃপক্ষ কী করছে?

এসব প্রশ্ন তোলা মানে ব্যক্তিগত দায়িত্বকে অস্বীকার করা নয়। বরং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আলাদা করে চিহ্নিত করা। একটি উন্নত গণপরিবহনব্যবস্থা শুধু সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না; বিপদে পড়া যাত্রীকে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করে।
আমাদের সন্তানদের কী শেখাচ্ছি? আমরা সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াতে চাই, ভালো চাকরি পেতে শেখাই, বিদেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখাই। কিন্তু তাদের কি শেখাই, বাসে একজন বৃদ্ধ উঠলে কী করতে হয়? হুইলচেয়ারে থাকা মানুষটির লিফটে ওঠার জায়গা করে দিতে হয় কেন? অসুস্থ কাউকে দেখলে ভিডিও না করে সাহায্যের উদ্যোগ নিতে হয় কেন?
এই শিক্ষাগুলো বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সামাজিক পরিসরে এগুলোর চর্চা করতে হবে।
একটি শিশু যখন দেখে তার বাবা-মা প্রবীণ ব্যক্তিকে আসন ছেড়ে দিচ্ছেন, তখন সে মানবিকতার একটি বাস্তব পাঠ পায়। একজন তরুণ যখন নিজের ক্লান্তি সত্ত্বেও অসুস্থ মানুষকে বসার সুযোগ দেন, তখন তিনি শুধু একটি আসন ছেড়ে দেন না; অন্যদের জন্যও একটি উদাহরণ তৈরি করেন। মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে এভাবেইÑছোট ছোট আচরণ থেকে।

মেট্রোরেল আমাদের গর্ব। এই অর্জনকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আধুনিক ট্রেনের কামরায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন অসুস্থ মানুষের জন্য যদি আমরা একটু জায়গা করে দিতে না পারি, তাহলে সেই আধুনিকতার পূর্ণ অর্থ উপলব্ধি করতে আমাদের আরও পথ হাঁটতে হবে।
ড. নাজিবুর রহমানকে কেউ একটি আসন দিলে তিনি বেঁচে যেতেন কি না, তা আমরা জানি না। তার মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করবে চিকিৎসাগত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত। কিন্তু তার অসুস্থতার মুহূর্তে সহায়তা চাওয়ার বর্ণনা আমাদের সামনে যে নৈতিক প্রশ্ন রেখেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আজ তিনি ছিলেন অন্য কারও বাবা। কাল সেই জায়গায় থাকতে পারেন আমার বাবা, আপনার মা, আপনার সন্তান, কিংবা আপনি নিজেই।
তখন আমরা চাইব, অপরিচিত কেউ এগিয়ে আসুক। কেউ একটু জায়গা করে দিক। কেউ জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করুক। কেউ অন্তত বলুক, ‘আপনি বসুন, আমি সাহায্য করছি।’ তাহলে আজ অন্যের প্রয়োজনে আমরা সেই কাজটি করতে পারব না কেন?
ইউরোপে প্রায় এক দশক বসবাসের অভিজ্ঞতা আমাকে অন্তত একটি কথা শিখিয়েছে: উন্নত সমাজের পরিচয় শুধু তার সড়ক, সেতু, ট্রেন কিংবা প্রযুক্তিতে নয়; পরিচয় মেলে সে সমাজ সবচেয়ে অসহায় মানুষটির সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যে।
আমাদের মেট্রোরেল আধুনিক হয়েছে। এবার আমাদের আচরণও আধুনিক হোক। কারণ, একটি আসন ছেড়ে দেওয়া ছোট কাজ হতে পারে; কিন্তু কখনো কখনো সেই ছোট কাজটিই হয়ে ওঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় পরিচয়।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]