নিউইয়র্কে বিনিয়োগের ডাক, টোকিওতে বড় প্রত্যাশা

নিউইয়র্কে বিনিয়োগের ডাক, টোকিওতে বড় প্রত্যাশা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। একদিকে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ। উন্নয়ন অর্থায়নের এই বাস্তবতায় শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। প্রয়োজন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, নতুন শিল্পায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মসংস্থানের বিস্তার। ঠিক এমন সময়েই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বান এবং জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের প্রত্যাশা সেই উদ্যোগেরই অংশ।

প্রধানমন্ত্রীর ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পর্ব ২৭ অক্টোবরের বাংলাদেশ–জাপান শীর্ষ বৈঠক। এই বৈঠক ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা। বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত আসবে, তা আগাম বলার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জাপানের মতো প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পে অগ্রসর দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার যে বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে, তা কীভাবে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন কারখানা, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে রূপ পাবে?

গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে জেপিমরগ্যান চেজের সদর দপ্তরে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বাংলাদেশকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু একটি বৈঠকে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। দেশের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, উৎপাদনশিল্পের অভিজ্ঞতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে আরও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

জ্বালানি, অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, উৎপাদনশিল্প, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাত বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এলে শুধু মূলধন বাড়বে না; উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়। তাঁরা দেখতে চান, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে কত সময় লাগে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ আছে কি না, কর ও শুল্কনীতিতে স্থিতিশীলতা রয়েছে কি না এবং চুক্তির সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত। বিনিয়োগের মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াও তাঁদের সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অর্থনৈতিক কূটনীতির সাফল্য তাই শুধু বিদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সেই আহ্বানের সঙ্গে দেশের ভেতরে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কার্যকর উদ্যোগ থাকতে হবে। নিউইয়র্কে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ ৬৬২.৩১ মিলিয়ন ডলার বিদেশি সহায়তা পেয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অর্থছাড় ছিল ১.১৪৮ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, একই সময়ে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১.৩৫১ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১.২৭৯ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ নতুন বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় কমেছে, অথচ পুরোনো ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে সরকারি অর্থব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হলে উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

তবে একই সময়ে উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এসেছে ১.২৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৯১০.৬৭ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি।

এই পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের সামনে অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কিন্তু সম্ভাবনার জায়গাও সংকুচিত হয়ে যায়নি। নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রতিশ্রুতিকে কার্যকর চুক্তি, সময়মতো অর্থছাড় এবং উৎপাদনশীল প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়া।

একই সঙ্গে ঋণ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে হবে। যেসব প্রকল্প থেকে উৎপাদন, রপ্তানি, রাজস্ব আয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল আসার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও অপচয় কমাতে না পারলে ঋণের অর্থ উন্নয়নের পরিবর্তে ভবিষ্যতের দায় বাড়িয়ে দিতে পারে।

ঋণ সব সময় অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক নয়। যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ঋণ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু ঋণ ব্যবহারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিশোধের সক্ষমতার সামঞ্জস্য না থাকলে তা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

টোকিওতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা: জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের এই ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে এখন বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদনশিল্প এবং দক্ষতা উন্নয়নে আরও বিস্তৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর সেই সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ২৭ অক্টোবরের শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা থাকবে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এমন একটি পর্যায়ে নেওয়া, যেখানে উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে।

জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬.৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে গাড়ি ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কথা উঠে এসেছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তারা ওই প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই এই অঙ্ককে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

তারপরও এ ধরনের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাপানি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও শিল্পদক্ষতা অর্জনের পথও প্রসারিত হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, সম্ভাব্য বিনিয়োগের আলোচনা যেন শুধু বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিনিয়োগের বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প, নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়নের কাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের মধ্যে এসব বিষয়ে আলোচনা ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ কতটা আসবে, কোন প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে এবং কী পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের ওপর।

বিদেশি বিনিয়োগের ঘোষণা অর্থনীতিতে আশাবাদ তৈরি করে। কিন্তু বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল পাওয়া যায় তখনই, যখন অর্থ বাস্তবে বিনিয়োগ হয়, কারখানা গড়ে ওঠে, উৎপাদন শুরু হয় এবং মানুষ কাজের সুযোগ পায়।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রতিটি পর্যায়ে অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সমঝোতা স্মারক, বিনিয়োগ প্রস্তাব, চূড়ান্ত চুক্তি এবং বাস্তব অর্থপ্রবাহ—এসবের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোন প্রকল্প কত দূর এগোল, কী বাধা রয়েছে এবং কখন উৎপাদন শুরু হতে পারে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে অনুমোদন, জমি, ইউটিলিটি সংযোগ, কর ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ হয়। বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বিনিয়োগকারীদের সময় ও অর্থের অপচয় কমাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে দেশীয় বেসরকারি খাতকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংযোগ তৈরি হলে দেশের ভেতরে নতুন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক মান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ফলে বিনিয়োগের সুফল শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শিল্পায়নের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী না থাকলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই কারিগরি শিক্ষা, শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তরের ব্যবস্থা থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। শুধু কম শ্রমব্যয় কিংবা বড় বাজারের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায় না। বিনিয়োগকারীরা চান স্থিতিশীল নীতিমালা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং ব্যবসা পরিচালনার পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ।

বাংলাদেশকে তাই ব্যবসা শুরুর জটিলতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ও লজিস্টিকসের ব্যয় কমানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিনিয়োগের জন্য জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

নীতির ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন, অস্পষ্ট বিধিবিধান কিংবা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তাঁদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বিনিয়োগবান্ধব নীতির ঘোষণা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার ধারাবাহিক প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতি ও অপচয় কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানো এবং চুক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিদেশে যে বার্তা দেওয়া হবে, দেশের ভেতরের বাস্তবতা যেন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন-সহযোগীর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাদের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতা অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগও অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার বাংলাদেশের অর্থায়নের উৎস বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা শক্তিশালী করতে পারে। তবে এসব সম্পর্কের সুফল পেতে হলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন, রপ্তানি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় কমেছে, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের সম্ভাবনা তুলে ধরার উদ্যোগ নতুন সুযোগের কথাও বলছে।

এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। শুধু ঋণের চাপ নিয়ে আলোচনা করলে অর্থনীতির সম্ভাবনার দিকটি আড়াল হয়ে যাবে। আবার বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ দেখালেও বাস্তব সমস্যার সমাধান হবে না।

নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান এবং টোকিওতে জাপানের সঙ্গে আসন্ন শীর্ষ বৈঠক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রথমটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। দ্বিতীয়টি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার সম্ভাবনা সামনে আনছে।

এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগগুলোকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ করা। কোন খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, কোন শিল্প রপ্তানি বাড়াতে পারবে, কোথায় প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে এবং কীভাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা শুধু বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং উৎপাদন, রপ্তানি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তির শক্তিতে এগিয়ে যাবে। বিদেশি পুঁজি আসবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে, এমন পরিবেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল উদ্দেশ্য।

নিউইয়র্কে বিনিয়োগের আহ্বান এবং টোকিওতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা তাই কেবল কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের অর্থায়ন কাঠামোকে আরও টেকসই করার প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারিত হবে বিনিয়োগের ঘোষণায় নয়, বাস্তব বিনিয়োগে; ঋণের অঙ্কে নয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে; আর কূটনৈতিক আশাবাদে নয়, মানুষের জীবনে তার দৃশ্যমান সুফলে। জাপানের সঙ্গে আসন্ন শীর্ষ বৈঠক সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি সুযোগ। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগ কাজে লাগানোর প্রস্তুতি, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের দৃঢ়তা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
e-mail: [email protected]