রাজনীতির ইতিহাসে স্লোগান কখনো নিছক শব্দ নয়। কখনো তা হয়ে ওঠে শ্রেণিসংগ্রামের ভাষা, কখনো গণ-অভ্যুত্থানের আহ্বান, কখনো জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। একটি স্লোগানের জন্ম হয় নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে; সময়ের সঙ্গে তার অর্থ বদলায়, বিস্তৃত হয়, কখনো আবার দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতেও আটকে যায়। তাই কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির স্লোগান নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু পরিচিত কয়েকটি বাক্য মুখস্থ করলেই চলে না, বুঝতে হয় সেগুলোর পেছনের ইতিহাস ও মতাদর্শ।
কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক স্লোগান 'দুনিয়ার মজদুর এক হও'। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর শেষ আহ্বানের সঙ্গে এটি যুক্ত। ইংরেজিতে স্লোগানটি পরিচিত 'Workers of the world, unite!' নামে। এর কেন্দ্রীয় বক্তব্য, শ্রমিকের অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামকে জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। পুঁজি যেমন আন্তর্জাতিক, শ্রমিকের সংহতির প্রশ্নটিও তেমন আন্তর্জাতিক।
কিন্তু কমিউনিস্ট রাজনীতির ইতিহাস এই একটি স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের সংগঠন, কৃষকের জমির দাবি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, পুঁজিবাদী শোষণের বিরোধিতা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা, এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন সময়ে নানা স্লোগান তৈরি হয়েছে।
'শ্রমিক-কৃষক এক হও' বামপন্থী রাজনীতির একটি বহুল পরিচিত আহ্বান। শ্রমিক ও কৃষকের সামাজিক অবস্থান এক নয়; তাঁদের সমস্যা ও স্বার্থেও পার্থক্য রয়েছে। তবু উৎপাদন, শ্রমের মূল্য এবং সম্পদের বণ্টনের প্রশ্নে তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। এই মিলের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলাই স্লোগানটির রাজনৈতিক তাৎপর্য।
বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে 'কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, জনগণতন্ত্র কায়েম কর' এবং 'মুক্তির এই পথ, সশস্ত্র বিপ্লব'-এ ধরনের স্লোগানও শোনা গেছে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বামপন্থীদের ব্যবহৃত স্লোগান হিসেবে এগুলোর উল্লেখ রয়েছে। এগুলো সেই সময়ের বিপ্লবী রাজনীতির একটি বিশেষ ধারার পরিচয় বহন করে; সব বামপন্থী দল বা সব কমিউনিস্ট সংগঠনের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে এগুলোকে দেখা ঠিক হবে না।
শ্রমিক আন্দোলনের আরেকটি পরিচিত দাবি- 'শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি চাই'। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, সংগঠন করার অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। একইভাবে কৃষকের
ন্যায্য মূল্য, জমির অধিকার এবং ঋণের বোঝা কমানোর দাবি বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: শ্রমিকের অধিকার বা কৃষকের ন্যায্য মূল্য কেবল কমিউনিস্টদের দাবি নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠনও এসব দাবি তুলতে পারে। কোনো দাবি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই সেটি একান্ত কমিউনিস্ট স্লোগান হয়ে যায় না।
'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' ভারতীয় উপমহাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির বহুল পরিচিত স্লোগান। এর অর্থ, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বামপন্থী ও বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে স্লোগানটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'কে শুধু কমিউনিস্টদের স্লোগান বলা ইতিহাসকে সংকীর্ণ করে দেখা হবে। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন মতাদর্শের বিপ্লবী ও রাজনৈতিক সংগঠন এটি ব্যবহার করেছে। একইভাবে 'বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক', 'সমাজতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক', 'শোষণমুক্ত সমাজ চাই'-এ ধরনের আহ্বান বামপন্থী রাজনীতির আদর্শগত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাস বুঝতে হলে ভাষা আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে তাকাতে হয়।
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল নানা রাজনৈতিক ধারা ও সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি বৃহৎ আন্দোলন। সে সময় ছাত্রসমাজের পাশাপাশি শ্রমিক, কৃষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনও সক্রিয় ছিল। স্লোগানে তাই একদিকে যেমন স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার উঠে এসেছে, অন্যদিকে শ্রেণিসংগ্রাম, কৃষকের দাবি এবং বিপ্লবী রাজনীতির ভাষাও স্থান পেয়েছে।
'ভোটের আগে ভাত চাই' স্লোগানটিও এই রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। এটি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভা-সমাবেশে ব্যবহৃত স্লোগান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্লোগানটি রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকারের সম্পর্ককে সামনে আনে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে 'জয় বাংলা' একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান। এটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধিকার এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের শ্রেণিভিত্তিক স্লোগান এক বিষয় নয়।
'দুনিয়ার মজদুর এক হও' আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির আহ্বান। 'জয় বাংলা' বাঙালির জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। দুটি স্লোগানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় মুক্তি, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিগুলো বিভিন্ন সময়ে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু সেই অংশগ্রহণের কারণে 'জয়
বাংলা'কে কমিউনিস্ট মতাদর্শের নিজস্ব স্লোগান বলা যায় না। আবার কোনো নির্দিষ্ট দল দীর্ঘদিন স্লোগানটি ব্যবহার করেছে বলেই তার ঐতিহাসিক অর্থকে শুধু দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করাও যথার্থ নয়।
বিভিন্ন দেশ, সময় ও রাজনৈতিক সংগঠনে ব্যবহৃত স্লোগানগুলোর মধ্যে কয়েকটি বহুল পরিচিত উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো। তালিকায় ঐতিহাসিক স্লোগানের পাশাপাশি বামপন্থী আন্দোলনে প্রচলিত দাবি ও আহ্বানও রয়েছে। এগুলো সব একই দলের আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়।
আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন
দুনিয়ার মজদুর এক হও!
সকল দেশের শ্রমিক এক হও!
শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি দীর্ঘজীবী হোক!
সমাজতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক!
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দীর্ঘজীবী হোক!
শ্রমিক-কৃষকের অধিকার
শ্রমিক-কৃষক এক হও!
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি চাই!
কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম চাই!
মেহনতি মানুষের ঐক্য গড়ে তোলো!
শ্রমিকের অধিকার আদায় করতে হবে!
শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম, চলবেই অবিরাম!
বিপ্লব ও শোষণবিরোধী রাজনীতি
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!
শোষণমুক্ত সমাজ চাই!
পুঁজিবাদী শোষণের অবসান চাই!
সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক!
বৈষম্যের অবসান চাই, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো!
বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যবহৃত স্লোগানের উদাহরণ
কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, জনগণতন্ত্র কায়েম কর!
মুক্তির এই পথ, সশস্ত্র বিপ্লব!
ভোটের আগে ভাত চাই!
কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির সামনে আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: স্লোগানের বক্তব্য বাস্তব জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি-এসব প্রশ্নে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অবস্থান ও কাজের মধ্য দিয়েই তাদের আদর্শের বাস্তবতা যাচাই করা যায়।
'দুনিয়ার মজদুর এক হও' নাকি 'জয় বাংলা' কোনটি কমিউনিস্ট স্লোগান
আবু জুবায়ের
মত-মতান্তর
৫৭ মিনিট আগে
২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৫ঃ১৮ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
