তাকাইচির বার্তা, তারেকের সুযোগ

তাকাইচির বার্তা, তারেকের সুযোগ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি নেতাদের শুভেচ্ছা বার্তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সব বার্তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ওজন এক নয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি যখন প্রকাশ্যে বলেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে "ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবেন" এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারকে "জোরালোভাবে সমর্থন" করবেন, তখন সেটি নিছক সৌজন্যের পরিসর ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর বার্তায় পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা সাধারণ মানুষের ভাষার মতো সরল নয়। সেখানে একটি শব্দ, একটি বাক্য কিংবা একটি বিশেষণও অনেক সময় দীর্ঘ ব্যাখ্যার সমান অর্থ বহন করে। তাকাইচির বক্তব্যেও তেমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে।

প্রথমত, জাপান স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো সরকারকে সমর্থনের ঘোষণা মূলত সেই সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতার প্রতি বিশ্বাসের প্রতিফলন। বিশেষ করে এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি যখন এমন অবস্থান নেয়, তখন সেটি বৈশ্বিক মহলেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।

দ্বিতীয়ত, জাপান বাংলাদেশকে এখন আর শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার একটি দেশ হিসেবে দেখছে না। তাকাইচির বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ইন্দো-প্যাসিফিক, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রসঙ্গ। এর অর্থ, বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।

বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা গড়ে উঠছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশটিকে ঘিরে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। জাপানও সেই বাস্তবতা অনুধাবন করছে।

তাকাইচির বক্তব্যে 'বিগ-বি' উদ্যোগকে নতুন রূপে এগিয়ে নেওয়ার যে ঘোষণা এসেছে, সেটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই উদ্যোগ জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি ছিল। এখন সেটিকে "শেয়ারিং প্রসপারিটি বিআইজি-বি" নামে নতুন কৌশলগত কাঠামোয় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা ঋণ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের তরুণ জনসংখ্যার কথাও উল্লেখ করেছেন। এটি কেবল প্রশংসা নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি। জনসংখ্যার বার্ধক্যে ভুগতে থাকা জাপান জানে, আগামী দিনের অর্থনীতিতে তরুণ জনশক্তি একটি বড় সম্পদ। বাংলাদেশের জন্য এটিও একটি সুযোগ, যদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কাজকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা যায়।

তবে এখানেই মূল প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সমর্থন কখনোই কোনো দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। সমর্থন সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হয় নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে। ইতিহাস বলছে, বিদেশি বন্ধুদের প্রশংসা অনেক দেশ পেয়েছে; কিন্তু স্থায়ী সাফল্য অর্জন করেছে তারা-ই, যারা সেই আস্থাকে সুশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রূপ দিতে পেরেছে।

জাপান বাংলাদেশকে সমর্থন করছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক খবর। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, কেন সমর্থন করছে। উত্তরটি সহজ। বাংলাদেশের রয়েছে ভৌগোলিক গুরুত্ব, বিশাল বাজার, তরুণ জনসংখ্যা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। অর্থাৎ জাপানের সমর্থনের পেছনে যেমন বন্ধুত্ব আছে, তেমনি রয়েছে বাস্তব কৌশলগত স্বার্থও।

তারেক রহমানের সরকারের জন্য এটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক আস্থাকে কতটা বাস্তব বিনিয়োগে, কতটা কর্মসংস্থানে, কতটা উন্নত শাসনে এবং কতটা জাতীয় স্বার্থে রূপ দেওয়া যায়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্য।

তাকাইচির বার্তা তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতি এক ধরনের আস্থার প্রকাশ। একই সঙ্গে এটি একটি প্রত্যাশার কথাও বলে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। আর ব্যর্থ হলে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির বহু সুন্দর বাক্যের মতো এটিও ইতিহাসের পাতায় একটি সৌজন্য বার্তা হয়েই থেকে যাবে।


লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।