ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের অবস্থানের বিরোধিতা করেছিলেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলের নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি এ অভিযানের বিরোধিতা করেন। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মঙ্গলবারের নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সোমবার চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারলে জামির নিজে পদত্যাগ না করলে তাকে বরখাস্ত করার আশঙ্কা রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইসরাইল।
এর আগে সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সিএনএন জানিয়েছিল, কয়েক সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা আবারও শুরু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দিয়েছিল ইসরাইল। তবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাতে রাজি হননি। এর পেছনে আংশিকভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন জামির।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধানকে তিনি সতর্ক করেছিলেন, ইরানে হামলা হলে ইসরাইলের নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। তবে নেতানিয়াহু ও কাটজ দু’জনই এসব প্রতিবেদন অস্বীকার করেছেন। জামিরের সঙ্গে ইরান সংশ্লিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে তাদের মতবিরোধ বাড়ছে বলে এর আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সোমবার সকালে কাটজ বলেন, নির্বাচনের আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে হামলার কোনো পরিকল্পনা ইসরাইলের নেই।
রোববার চ্যানেল ১২ প্রথম জানায়, নেতানিয়াহুর নির্দেশে ইরান সংশ্লিষ্ট একটি সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার সঙ্গে জামিরের ‘নজিরবিহীন সংঘাত’ চলছে। ওই পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের ঠিক আগে এটি ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে। টেলিভিশন নেটওয়ার্কটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জামির সামরিক পদক্ষেপটি বাস্তবায়নে আপত্তি জানাচ্ছিলেন। এ বিষয়ে আরও আলোচনা করার পাশাপাশি পদক্ষেপটির আইনি অনুমোদন রয়েছে- এমন লিখিত নথিতে নেতানিয়াহুর স্বাক্ষরও চেয়েছিলেন তিনি।
সোমবারের প্রতিবেদনে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে চ্যানেল ১২ জানায়, সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে জামির সতর্ক করেছিলেন, কাটজ ও নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত পদক্ষেপকে ইরান ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং আগাম হামলা চালিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তবে শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনি ও মোসাদের প্রধান রোমান গোফম্যান অবিলম্বে ওই পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে ছিলেন। জামিরের মতো তাদেরও বর্তমান মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। টেলিভিশনটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় গোফম্যান বলেছিলেন, সময় আমাদের পক্ষে নেই।
আলোচনায় অংশ নেয়া বিমানবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল ওমের টিশলার এবং সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান মেজর জেনারেল শ্লোমি বিন্ডারের অবস্থান কী ছিল, তা নিশ্চিত করতে পারেনি চ্যানেল ১২। এদিকে দৈনিক হারেৎসের পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর সাবেক সামরিক সচিব গোফম্যান ইরানে হামলার প্রস্তাব নিয়ে মোসাদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। ওই কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগে হামলার বিরোধিতা করছেন। তাদের উদ্বেগ, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। মোসাদ তাদের কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও বলেছে, মতবিনিময় একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তির উৎস, উত্তেজনার লক্ষণ নয়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, তারা কেবল নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের ভিত্তিতেই কাজ করে।
এদিকে সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, হেবরনে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া নিয়েও নেতানিয়াহু ও জামিরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই শহরে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীরা সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হন। এরপর অভিযান শুরু করে আইডিএফ। এ অভিযানের কারণে প্রায় তিন হাজার ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
কানের উদ্ধৃত সূত্রগুলো জানায়, শনিবার রাতেই অভিযান এক দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে ঘোষণা দিতে চেয়েছিল আইডিএফ। কিন্তু নেতানিয়াহু অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। রোববার তেল নোফ বিমানঘাঁটিতে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মূল্যায়ন বৈঠকে জামির বলেন, হেবরনে অভিযান অব্যাহত রাখার কোনো সামরিক প্রয়োজন নেই। ফিলিস্তিনিদের নিজেদের বাড়িতে ফিরতে বাধা দেয়ারও কোনো আইনি ভিত্তি নেই। সম্প্রচারমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামির নেতানিয়াহুকে অভিযান শেষ করার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করেন।
