মা হওয়ার আর মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা। ৯ মাসের গর্ভে অনাগত সন্তানকে নিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন তানিয়া কামাল নিহাত (২০)। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিভে গেল তার জীবন। চট্টগ্রামের পটিয়ায় স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে যৌতুক ও উপহারের জন্য নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে এই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর। রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই মোনাফ হাজীর পাড়ায় তানিয়ার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার স্বামী নুর উদ্দিন (২৫)কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
তানিয়ার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক ও উপহারের জন্য তাকে চাপ দেয়া হতো। দাবি পূরণ করতে না পারায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো তাকে। তানিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণখাইন গ্রামের মোহাম্মদ কামালের মেয়ে। তার স্বামী নুর উদ্দিন হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মোনাফ হাজীর পাড়ার কাঞ্চন মিয়ার ছেলে।
জানা গেছে, তানিয়া ও নুর উদ্দিনের মধ্যে চার থেকে পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর নতুন সংসার গড়েছিলেন তারা। তবে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সংসারে বিরোধ দেখা দেয় বলে জানিয়েছে তানিয়ার পরিবার। তানিয়ার বাবা মোহাম্মদ কামালের অভিযোগ, গত ঈদে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন নতুন কাপড়চোপড় ও উপহার দাবি করেছিলেন। রমজান মাসে তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দিয়েছিলেন। সম্প্রতি আবারো কাপড়চোপড় ও যৌতুক দাবি করা হয়। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই দাবি পূরণ করতে পারেননি তিনি। এরপর মেয়ের ওপর নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ তার।
তানিয়ার বড় বোনের কণ্ঠেও ঝরে পড়ে অসহায়ত্বের কথা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের পর থেকেই উপহারের জন্য তার বোনকে মারধর করা হতো। এমনকি তাদের সামনেও মারধর করা হয়েছে। বোনের সংসারের কথা চিন্তা করে তারা অনেক কিছু সহ্য করেছেন, প্রতিবাদ করতে পারেননি। পরিবারের দাবি, তানিয়ার সংসারের বিরোধ মেটাতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার স্বজনেরা।
তানিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই পটিয়ায় মারা যান তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিফাতুন নুর (২২)। গত ১৪ই অক্টোবর বাবার বাড়ি থেকে তৈরি করে নেয়া নাশতার পরিমাণ কম হওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাকে মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করার পর টানা ৯ দিন চিকিৎসাধীন থেকে ২৩শে অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। জানা গেছে, সিফাতুন চন্দনাইশ পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরের মেয়ে। প্রায় পাঁচ মাস আগে পটিয়ার কুসুমপুরা ইউনিয়নের পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের দুবাইপ্রবাসী মো. তারেক (২৬)-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী বিদেশে থাকায় তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।
গত ১৪ই অক্টোবর সন্ধ্যায় সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিজের হাতে তৈরি নাশতা নিয়ে যান। নাশতার পরিমাণ কম হওয়া নিয়ে সেখানে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। একপর্যায়ে সিফাতুনের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম তার বেয়াইন জুহিনুর আক্তারকে মারধর করেন। একই সময় পরিবারের অপর দুই সদস্য রাশেদা বেগম ও সুমি আক্তার সিফাতুনের চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে মা ও মেয়েকে উদ্ধার করেন। ঘটনার পর সিফাতুনকে গুরুতর অবস্থায় চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৩শে অক্টোবর দুপুরে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই ১৪ই অক্টোবর পটিয়া থানায় শাশুড়িসহ তিনজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন সিফাতুনের মা।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, তানিয়ার স্বামী নুর উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। সিফাতুনের শাশুড়িকে মামলার পর আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। দুইটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
