ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন, প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে

বিবিসি ইন-ডেপথ

ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন, প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে

ফন্ট সাইজ:

ইসরাইলে আজ মঙ্গলবার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং এর এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নির্বাচন। দুই দেশের লাখ লাখ ভোটারের এই নির্বাচনী সিদ্ধান্তের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার টিপ ও’নিল একসময় বলেছিলেন, ‘সব রাজনীতিই স্থানীয়।’ তবে এবারের ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং দুটি নির্বাচন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইসরাইলের ভবিষ্যৎ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং অঞ্চলজুড়ে চলমান যুদ্ধগুলোর গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এলে তা এসব যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে। দুই দেশের নির্বাচনের মধ্যে সরাসরি একটি যোগসূত্রও রয়েছে। রিপাবলিকানস ওভারসিজ ইসরাইলের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ লাখ ইসরাইলি নাগরিকের মার্কিন পাসপোর্ট রয়েছে। ফলে তারা দুই দেশের নির্বাচনেই ভোট দেয়ার সুযোগ পান। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মার্ক জেল বলেছেন, এসব ভোটার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

ইরান ইস্যুতে নির্বাচনের প্রভাব

দুই দেশের নির্বাচনের নীতিগত যোগসূত্র আরও গভীর। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি হতে পারে।

ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয় এবং দেশটির নেতৃত্বের বড় একটি অংশ নিহত হয়েছে।

পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনী প্রচারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইরান ইস্যুতে নতুন করে হামলার জল্পনা বাড়িয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুই নেতারই ইরানে ‘শিগগির কাজ শেষ করা’ উচিত।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কী করবেন ট্রাম্প?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তাদের ধারণা, ঘরোয়া রাজনীতির নির্বাচনী চাপ কমে গেলে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে শেষবারের মতো বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হলে দেশটির জনগণ সরকার উৎখাতে উৎসাহিত হতে পারে। তবে অন্যরা একে অবাস্তব প্রত্যাশা বলে মনে করছেন। অতীতে বারবার ব্যর্থ হলেও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলে এই কৌশলের প্রতি সমর্থন রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের একজন প্রভাবশালী কূটনীতিক বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে ভাববেন। দেশের অভ্যন্তরীণ জটিল পরিস্থিতি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে নিজের উদ্যোগ ও সক্ষমতা দেখাতে চাইবেন।’

এদিকে ইসরাইলের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইরানের হুমকি মোকাবিলা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।

তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে এমন একজন প্রধানমন্ত্রী আসতে পারেন, যার ইরানে নতুন হামলা চালানোর বিষয়ে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা তুলনামূলক কম।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও বদলাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘ইসরাইলের নেতা ভুল ব্যক্তি হলে, অর্থাৎ বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) ছাড়া অন্য কেউ হলে, আমেরিকাকে নিজেরাই এই কাজ করতে হবে। আর আমি তা করতে আগ্রহী নই।’

তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা যে ওয়াশিংটনের নির্বাচনী জনমত জরিপের দিকে নিবিড় নজর রাখছেন, তা অস্বাভাবিক নয়। তবে নির্বাচনের পর নতুন করে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরান কঠোর পাল্টা জবাব দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগত আলোচনায় বিমানবন্দর, পাইপলাইন, সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবল, জ্বালানি স্থাপনা, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এ লেখা এক নিবন্ধে সতর্ক করে বলেছেন, নতুন হামলা হলে ‘বেসামরিক মানুষের জীবন, আঞ্চলিক সব দেশের কল্যাণ এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।’

বিশ্ব অর্থনীতিও নির্বাচনের কেন্দ্রে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র বিশ্ব অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যমূল্য বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।

ইসরাইলেও জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কম মজুরি এবারেএ নির্বাচনী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সরকারি অর্থের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে কী হবে?

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেরও অবসান ঘটতে পারে। দুই নেতার সম্পর্কে কখনো ঘনিষ্ঠতা, কখনো মতবিরোধ দেখা গেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ বলে প্রশংসা করেন। আবার গ্রীষ্মকালে তাকে ‘ভীষণ পাগল’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।

ইসরাইলে নতুন নেতা ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাকে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে দুই দেশের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা বেশি আসন বা নিয়ন্ত্রণ পেলে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ হতে পারে।

তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা থাকবে। ফলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালেও যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না।

চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে।

তাই দুই দেশের ভোটাররা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা শুধু তাদের নিজ নিজ দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বিশ্ব কোন পথে এগোবে, সেটিও নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।