দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে ছয় জেলায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে ফরিদপুরে। এ জেলায় মা-ছেলেসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ত্রিমুখী সড়ক দুর্ঘটনায় বালুবোঝাই ট্রাকচাপায় ইজিবাইকে থাকা মা-ছেলে নিহত হয়েছে। শুক্রবার বিকাল ৪টায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের জেলা সদরের কানাইপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার আলোকদিয়া গ্রামের সুমি বেগম (৩২) ও তার ছোট ছেলে শাওন (৭)। এ ছাড়া, সুমি বেগমের স্বামী পলাশ (৩৮)সহ গুরুতর আহত অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর শহর থেকে একটি বালুবাহী ট্রাক কানাইপুরের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় সামনের দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ট্রাকটির চাকা বিস্ফোরিত হয়ে মহাসড়কের উপর উল্টে যায়। এ সময় সামনে থেকে আসা প্রাইভেটকার ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ট্রাকটির নিচে চাপা পড়ে। এতে প্রাইভেটকারটির একাংশ ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ইজিবাইকটি বালু এবং ট্রাকের নিচে পুরোপুরি চাপা পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ ইজিবাইক থেকে আহত অবস্থায় তিনজন এবং প্রাইভেটকার থেকে একজনকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক দু’জনকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে করিমপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সালাম জানান, ইজিবাইক থেকে আহত অবস্থায় তিনজন এবং প্রাইভেটকার থেকে একজনকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক দু’জনকে মৃত ঘোষণা করেন।
অপরদিকে, জেলার মধুখালী উপজেলায় বাস-এম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার বিকালে উপজেলার আড়কান্দি এলাকায় এ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে দু’জন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। নিহদের মধ্যে একজনের নাম রাব্বি। বাকিদের নাম পাওয়া যায়নি। হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকাগামী কিংফিশার পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মাগুরাগামী একটি এম্বুলেন্সের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হয়। ফরিদপুরের করিমপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, বাস-এম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন।
বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, নাটোরের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে কমপক্ষে আরও ১২ জন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের উপজেলার থানার মোড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। বনপাড়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জাহেদুল ইসলাম দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী দেশ ট্রাভেলসের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা তাবাসসুম ট্রাভেলসের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। জাহেদুল ইসলাম আরও জানান, হতাহত ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ চলছে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় যাত্রীবাহী বাস ও মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন যাত্রী। গতকাল দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে উপজেলার নয়াপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- টেকনাফ উপজেলার আবদুল্লাহ (২৭) ও চকরিয়া উপজেলার মো. ইয়াছিন (৩০)। দুর্ঘটনার সময় নিহত দু’জন পিকআপ ভ্যানটিতে ছিলেন। পিকআপ ভ্যানটি চকরিয়া থেকে টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে সবজি নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে সংঘর্ষের সময়ে ট্রাকটি মহাসড়কের ওপর উল্টে যায়। বিকট শব্দে স্থানীয়রা ও পথচারীরা এগিয়ে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ। তবে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় দুই যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। মালুমঘাট হাইওয়ে থানা পুলিশ জানান, নিহতদের লাশ উদ্ধার ও গাড়ি দু’টি জব্দ করা হয়েছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে জুলেখা বেগম (৫৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া-পঞ্চগড় সড়কে বারুনী কালীবাড়ি নামক স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত জুলেখা বোদা সদর ইউনিয়নের মাহানপাড়ার আব্দুর কুদ্দুসের স্ত্রী। স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, একটি ভ্যান রিকশাযোগে মাড়েয়া থেকে বোয়ালমারীর দিকে যাচ্ছিলেন জুলেখা। পথে বারুনী সাত হাত কালীবাড়ি নামক স্থানে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে রাস্তায় ছিটকে পড়েন। এ সময় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।
মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, মাদারীপুরে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের রেকারের সঙ্গে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় সেলিম হাওলাদার নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। গতকাল ভোরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সদর উপজেলার তাঁতীবাড়ী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সেলিম মাদারীপুর পৌরসভার বাগেরপাড় এলাকার মৃত নাজিম উদ্দীন হাওলাদারের ছেলে। তিনি পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার হোটেল মেট্রো নামে একটি আবাসিক হোটেলের মালিক। পুলিশ ও স্বজনরা জানান, তিনি প্রাইভেটকার চালিয়ে কালকিনির ভূরঘাটা থেকে মাদারীপুর শহরে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তাঁতীবাড়ী এলাকায় এলে নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। এ সময় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি উদ্ধার কাজে নিয়োজিত পার্কিং করা হাইওয়ে পুলিশের রেকারের সঙ্গে প্রাইভেটকারের ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হন সেলিম। পরে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মারুফ রহমান জানান, মরদেহ সুরতহাল শেষে পারিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।ু
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, ?খাগড়াছড়ির পানছড়িতে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চাকা খুলে সড়ক থেকে ছিটকে পড়ে এক শিশু নিহত হয়েছে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন শিশুটির মা-বাবা, বিজিবি সদস্যসহ আরও তিনজন। গতকাল উপজেলার লতিবান প্রিন্সিপাল পাড়া সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ?নিহত তানিয়া আক্তার (১২) উপজেলার পুরাতন বরনাল এলাকার মো. আনোয়ার হোসেনের মেয়ে। দুর্ঘটনায় আহতরা হলেন- নিহত শিশুর মা ডেইজি আক্তার (৩৫), বোন আঁখি আক্তার (১৭) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েব সুবাদার আব্দুর রাজ্জাক। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। বিজিবি সদস্য আব্দুর রাজ্জাককে পানছড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গুইমারা বিজিবি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহত অন্যদের পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত যানটি জব্দ করেছে এবং চালককে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান ওসি।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ি সড়কের বিপজ্জনক মোড়গুলোতে প্রায়শই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। তদারকির অভাবে লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন অটোরিকশাগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করায় যাত্রীদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে পড়ছে। অনতিবিলম্বে এসব অবৈধ যানবাহন বন্ধ ও ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী। ?পানছড়ি থানার অফিসার্স ইনচার্জ ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই চালক গাড়িটি রেখে পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
