কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থার বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। বাবা মায়ের কোল ছেড়ে কোমলমতি শিশুরা যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের স্নেহস্পর্শে নিজেদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার কথা, তখন সেসব শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সময় কাটে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে। এই বুঝি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে মাথার উপর খসে পড়ছে পলেস্তারা। শুধু তাই নয়, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে বেরিয়ে রয়েছে জরাজীর্ণ মরচেপড়া রড যা শিক্ষার্থীদের আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট। একদিকে শিক্ষকের পাঠদান, অন্যদিকে পাশের শ্রেণির কোলাহল, এভাবেই ব্যাহত হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। এমন চিত্র দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২১৭টি। এর মধ্যে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে নির্মিত ৩ কক্ষবিশিষ্ট অনেক বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় বিকল্প স্থানে চলছে পাঠদান, আবার কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষা অফিসের হিসাবে, উপজেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ হয়নি এবং পুরনো ভবনগুলোও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে যা দেখা গেছে, উপজেলার ৯১ নম্বর চর আমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ কক্ষবিশিষ্ট মূল ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে আগের একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন। পাশেই ৯২ নম্বর পিপুলবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। সেখানে জরাজীর্ণ ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সিঁড়ির কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
পর্দার দুই পাশে পৃথক দুটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে দুই শিক্ষককে। এমনকি ব্ল্যাকবোর্ডও ভাগ করে ব্যবহার করতে দেখা গেছে শিক্ষকদের। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমি খাতুন বলেন, কক্ষ সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই পর্দা টাঙিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। একই সময়ে দুই শিক্ষক পাঠদান করায় শব্দ মিশে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ নষ্ট হয়। তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জানান, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১০৮ জন। স্বাভাবিকভাবে একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারে। কিন্তু কক্ষের অভাবে কখনো দুটি শ্রেণির ৪০ থেকে ৪২ জন শিক্ষার্থীকে এক কক্ষে বসিয়ে পাঠদান করাতে হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাক আহম্মেদ জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ইতিমধ্যে অনেক বিদ্যালয় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে নির্মিত ভবনগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। শিশুদের জন্য বিদ্যালয় হবে নিরাপদ আশ্রয়, জ্ঞান অর্জনের আনন্দময় স্থান ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। যেখানে থাকবে না ভয় আর নিরাপত্তা ঝুঁকির আতঙ্ক। শিশুর স্বপ্ন যেন ভেঙে পড়া ছাদের নিচে চাপা না পড়ে, শ্রেণিকক্ষের কোলাহলে যেন হারিয়ে না যায় তার শেখার আগ্রহ। তাই জরাজীর্ণ ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই, প্রয়োজনীয় সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল।
