খাল, বিল আর কচুরিপানায় ঘেরা পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী-দোবড়া ইউনিয়ন। আবহমানকাল থেকেই এ অঞ্চলের ইতিহাস মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক জীবনপণ সংগ্রামের ইতিহাস। জলবায়ু ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা জনপদটির বুকে আজও লেগে আছে বঞ্চনার চিহ্ন। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও, অধিকাংশ এলাকায় পাকা রাস্তা, নিরাপদে বিদ্যাপীঠে যাওয়ার পথ কিংবা মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর মতো অতিসাধারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ জনপদের মানুষ। যুগ যুগ ধরে এই এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা পানিপথ। অথচ বছরের প্রায় তিন মাস যখন খাল-বিলগুলো কচুরিপানার নিবিড় জালে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন থমকে দাঁড়ায় জীবনযাত্রার চাকা। হারিয়ে যায় স্বাভাবিক নৌচলাচল। আর এই নদী-খালের কঠিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিকার হয় এ অঞ্চলের নিষ্পাপ শিশুরা।
ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বই-খাতা বুকে চেপে স্বপ্ন নিয়ে গৃহকোণ ছাড়ে এ দুরন্ত শিশুরা। কিন্তু পিচঢালা পথের অভাবে পানি আর কচুরিপানার সঙ্গে যুদ্ধ করেই তাদের পৌঁছাতে হয় পাঠশালায়। যে বয়সে হাসি-আনন্দে রঙিন হওয়ার কথা শৈশব, সেই বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পার হতে হয় বিলের সীমানা। স্থানীয় কোমলমতি শিক্ষার্থী কারিমা ইসলাম তার অবোধ্য কষ্টের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলে। আমাদের স্কলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। রাস্তা থাকলে সহজে যেতে পারতাম। কচুরিপানায় খাল আটকে গেলে নৌকায় চলাচলও কঠিন হয়ে যায়। আরেক শিক্ষার্থী মহিমা তার আকুল আকুতি জানিয়ে বলে- আমরা চাই, আমাদের এলাকায় ভালো রাস্তা হোক। যেন প্রতিদিন কোনো ঝামেলা ছাড়াই স্কুলে যেতে পারি এবং ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারি।
শিশুদের এই দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের পিতামাতার অন্তহীন দুশ্চিন্তা। সন্তান স্কুলে গিয়ে নিরাপদে ফিরবে তো? তাদের চাওয়া, আগামী প্রজন্মের সোনালী ভবিষ্যতের স্বার্থেই যেন এই দুর্গম জনপদে নির্মিত হয় টেকসই সড়ক। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা মো. আইয়ুব আলী আফসোসের সুরে বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য প্রতিদিন কষ্ট করতে হয়। রাস্তাঘাট হলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এলাকার সবারই উপকার হবে। আমরা চাই, আমাদের দুর্ভোগের দিকে কর্তৃপক্ষ নজর দিক।
শুধু শিক্ষা নয়, কৃষিপ্রধান এই দেউলবাড়ী-দোবড়ার অর্থনীতিও বন্দি হয়ে আছে পানিপথের শিকলে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কৃষক ফসল ফলায়, যোগাযোগের অভাবে সেই ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। সামান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ কিংবা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসা পাওয়া যেন এক অলৌকিক ব্যাপার। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রবিউল স্মৃতি ও যন্ত্রণার কথা টেনে বলেন, কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এলাকায় একটি হাসপাতাল হলে মানুষের অনেক উপকার হতো।
