ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক যেন এখন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের জন্য এক মৃত্যুফাঁদ। এর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিতর্কিত ‘সেলফী পরিবহন’। বিগত সরকারের আমল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও থামেনি এই ঘাতক পরিবহনের বেপরোয়া তাণ্ডব। রুট পারমিট জালিয়াতি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনের শিথিল তদারকির কারণে মহাসড়কে প্রতিনিয়তই ঝরছে তাজা প্রাণ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেলফী পরিবহন। বিআরটিএ মানিকগঞ্জের সহকারী পরিচালক মাহবুব কামালের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবহনের নামে মাত্র ৬৪টি বাসের বৈধ রুট পারমিট থাকলেও অবৈধভাবে চলছে আরও ১০৬টি বাস। অর্থাৎ বিআরটিএ’র সরজমিন জরিপেই ১৭০টি বাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ- কাগজে-কলমে এই সংখ্যা ১৭০টি হলেও বাস্তবে এই ব্যানারে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, সেলফী পরিবহনের চালকদের সিংহভাগের কাছেই কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এমনকি মাদকাসক্ত ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক-হেলপারদের দিয়ে বাস চালানোর মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। অতীতে সেলফী পরিবহনের ক্ষমতার দাপট এমনই ছিল যে, এর বিরুদ্ধে টক্কর দেয়ার কেউ ছিল না। বছর কয়েক আগে ঘিওর উপজেলার তরা কালীগঞ্জ সেতুর পশ্চিম ঢালে সেলফী পরিবহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে দুই মোটরসাইকেল আরোহী আশিক মিয়া ও জুয়েলের মৃত্যুর পর বিক্ষুব্ধ জনতা গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর চালায়। অথচ মর্মান্তিক সেই ঘটনায় নিহত দুই যুবকের পরিবারের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা হয়। এই ঘটনায় সবচেয়ে মর্মান্তিক মোড় আসে তখন, যখন নিহত আশিকের শোকসন্তপ্ত পিতা মো. মহিদুর রহমানের নামেই দায়ের করা হয় মামলা। তৎকালীন সময়ে সেলফী পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রভাব ও ক্ষমতার দাপটের কাছে যে কারোরই লড়াই করা ছিল বলতে গেলে অসম্ভব। মহিদুর রহমান সন্তানের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণের মামলা করলেও ৪ বছর ধরে সেটা আদালতের রায়ের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। এখনো সন্তানের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন অসহায় পিতা। সেলফী পরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধ এবং অবৈধ রুট পারমিট বাতিলের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে স্থানীয় নাগরিক সমাজ। ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সকালে মানিকগঞ্জের বরংগাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সেলফী পরিবহনের একটি বাসের চাপায় অটোরিকশার দুই যাত্রী মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। এ ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং মহাসড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তীব্র জনক্ষোভের মুখে অবশেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সেলফী পরিবহনের সকল বাস চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয় জেলা প্রশাসন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা জানান, মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং রুট পারমিট ছাড়া চলা অবৈধ বাসের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
