২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। ২০২৪ সালে এই অবস্থান ছিল ১৪তম। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের (৪২) চেয়ে অনেক নিচে। অবশ্য গত বছরের চেয়ে এবার বাংলাদেশের ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়েছে এক ধাপ। দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম। বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ঢাকার কার্যালয়ে গতকাল এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জানায়, ২০১২ সাল থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের এবারের স্কোর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এটি প্রমাণ করে যে, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরও বাস্তবিক অর্থে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। বরং গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্যভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবসমূহ অবহেলিত হওয়া অথবা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারাও তাদের প্রকৃত ভূমিকা পালন করতেও ব্যর্থ হয়েছে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ বছর এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন- সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভুক্ত ছিল না। তিনি বলেন, সূচকের এবারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশ এমন দেশসমূহের মধ্যে আছে, যারা দুর্নীতির লাগাম টানতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর (২৪) বৈশ্বিক গড় স্কোর (৪২)-এর তুলনায় ১৮ পয়েন্ট এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় স্কোর (৪৫)-এর তুলনায় ২১ পয়েন্ট কম। এমনকি সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত অঞ্চল সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর ৮ পয়েন্ট কম। তাই বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা অতি উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে হয়, ২০২৫ সালের সূচকে ৮৯ স্কোর পেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক: ৮৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড ও ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর। আর ৯ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া: ১০ স্কোর পেয়ে নিম্নক্রম অনুযায়ী দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলা এবং ১৩ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরিত্রিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এবারের বৈশ্বিক গড় স্কোর সর্বনিম্ন ৪২। আর সিপিআই-এ অন্তর্ভুক্ত ১৮২টির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ (১২২টি) দেশের স্কোর ৫০ এর নিচে। বৈশ্বিকভাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪৮টি দেশের স্কোর বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬৮টি দেশের স্কোর কমেছে এবং ৬৪টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১২ সাল থেকে এই সূচকে ৩১টি দেশের উন্নতি হলেও, ৫০টি দেশের অবনতি হয়েছে।
২০২৫ সালের সিপিআই অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে পাঁচটি দেশের স্কোর ১ থেকে ৩ পয়েন্ট পর্যন্ত উন্নতি হয়েছে। বাকি দুইটি দেশের ১ পয়েন্ট করে অবনমন এবং একটি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার স্কোর সর্বোচ্চ ৩ পয়েন্ট এবং বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের ১ পয়েন্ট করে উন্নতি হয়েছে। আর ভুটান ও আফগানিস্তানের স্কোর ১ পয়েন্ট কমেছে এবং নেপালের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান সর্বোচ্চ চৌদ্দ ধাপ, মালদ্বীপ ও ভারতের পাঁচ ধাপ এবং বাংলাদেশের অবস্থানের এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। তবে নেপালের অবস্থান দুই ধাপ, পাকিস্তানের এক ধাপ এবং আফগানিস্তানের অবস্থান সর্বোচ্চ চার ধাপ অবনমন হয়েছে। আর ভুটান এক স্কোর কম পেলেও তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভুটান ছাড়া এ বছরও বাকি সাতটি দেশ সূচকের গড় স্কোর ৪২-এর কম পয়েন্ট পেয়েছে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা বেশ উদ্বেগজনক।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টিআই চ্যাপ্টারের মতো টিআইবিও দুর্নীতির ধারণা সূচক দেশীয় পর্যায়ে প্রকাশ করে। সিপিআই ২০২৫ এর তথ্যসূত্র হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য বিশ্বখ্যাত ১২টি প্রতিষ্ঠানের সর্বমোট ১৩টি জরিপ ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গতবারের মতো এবারো ৮টি জরিপ ব্যবহৃত হয়েছে।

লিমা
৫ মাস আগেতার মানে আওয়ামী কর্মকর্তা, কর্মচারীরা বহাল তবিয়তে আছে।