নির্বাচনী এলাকার আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে পূজা দেখার সময় পুলিশের নিরাপত্তা পেলেও সরাইল থানা পুলিশ এলাকার সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে নিরাপত্তা
দেয়নি। উল্টো এমপিকে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে চলার পরামর্শ দেন ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া। এমপি’র ফোনও ধরেন না ওসি। আর এ নিয়েই বৃহস্পতিবার রাতে থানায় গিয়ে ওসি’র ওপর চটেন রুমিন ফারহানা। সে সময় ওসি দুর্নীতিবাজ এবং আওয়ামী লীগের চোর ওসি বলেও অভিযোগের তীর ছুড়েন। এমপি-ওসি’র বাকবিতণ্ডা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সূত্রমতে, সদ্যসমাপ্ত শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে নিরাপত্তা প্রদানের জন্য বলা হলেও ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা করেননি। নিরাপত্তা না দেয়ার কারণ এবং ওসি’র বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওইদিন রাত ৮টার দিকে থানায় যান রুমিন ফারহানা। রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি থানায় ওসি’র কক্ষে অবস্থান করেন।
রুমিন ফারহানার সঙ্গে আসা এক ব্যক্তি ওসি তার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে সামনা-সামনি অভিযোগ করেন। রুমিন ফারহানার পিএস বলেন, তাকে কতোবার ফোন দিয়েছি ধরে না। এ সময় ওসি হাত উঁচিয়ে কথা বললে আরও চটেন ব্যারিস্টার রুমিন। খুলে বসেন ওসি’র বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝাঁপি। ওসিকে বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি স্যার। যাই হোক সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।’ পরে রুমিন ফারহানা সাংবাদিকদের বলেন, ওনি (ওসি) বলেন যে, ওনি নির্বাচিত এমপি, ওনার নিরাপত্তা মানুষ দেবে। এজন্যই মানুষ যা দেখছেন, ওরা আমার নিরাপত্তা দিচ্ছে। আমার তো নিরাপত্তা লাগবে।
আর ওনার (ওসি) বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মাটি কাটার থেকে পয়সা নেয়া, ইটের ভাটার পয়সা নেয়াসহ বিস্তর অভিযোগ। এলাকাটা দাঙ্গাপ্রবণ, দাঙ্গা হওয়ার পরে যখন সব শান্ত হয়, তখন ওনারা যান। এ বিষয়গুলোই আমি জানতে এসেছিলাম। ওনি যেই ব্যবহার আমার সঙ্গে করেছেন, সেটা একজন নির্বাচিত এমপির সঙ্গে করা যায় না। ওদিকে আগে না বলে থানায় এসে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন বলে অভিযোগ করেন ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া। পূজার সময় নিরাপত্তা না দেয়ার কথা স্বীকার করে ওসি বলেন, আমরা সবাই বিজি ছিলাম পূজার নিরাপত্তার জন্য। তখন ব্যাক্তি নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব ছিলো না। এ ঘটনার পর চকোরিয়া থানায় কর্মরত থাকাকালে মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাকে প্রত্যাহারে সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমের ভিডিও বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হয়। মনজুর কাদের ভূঁইয়া গত বছরে ৭ডিসেম্বর সরাইল থানায় যোগ দেন।
রুমিন ফারহানার থানায় আসা এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ওসি মনজুর কাদের সাংবাদিকদের বলেন, সংসদ সদস্য এশার নামাজের পরপর রাত ৮টার দিকে থানায় আসেন। আমি সাদরে উনাকে বসাই। এসেই রুদ্রমূর্তি। থানার আইনশৃঙ্খলার অবনতি, এটা নেই, ওটা নেই। আমি বললাম, আমরা প্রত্যেকটা ঘটনাকে এড্রেস করি। যেখানে মামলা হয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি গায়েবী, কাল্পনিক কথাবার্তা বলা শুরু করেন। একপর্যায়ে মবের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। ১৫০ জন লোক নিয়ে এসেছে। আমার অফিস কক্ষে ২৫-৩০ জন লোক ছিলো। তারা চরমভাবে মারামারির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তারপর আমি বললাম আপনি মব সৃষ্টি করার জন্য এদেরকে আমার অফিসে নিয়ে আসছেন। তারপর তিনি অনেক উচ্চবাচ্য করেন। আমি অনেক দুঃখ পাইছি। উনি দায়িত্বশীল একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এ ধরনের আচরণ আশা করিনি। আমি এসব ভিডিও করতে চাইলে একপর্যায়ে আমার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। ওসি বলেন, আমি অথরিটিকে জানিয়েছি। অথরিটি যেভাবে ডিশিসান দেয় সেভাবে যাবে।
ওসি আরও বলেন, মব সৃষ্টি করেছেন। হৈ-চৈ করেছেন। শত শত লোক নিয়ে মিছিল করা, ওসি’র অফিস কক্ষে হৈ-হট্টগোল করা। অনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য চাপ দেয়া। উনি ইলিগেশন দিয়েছেন আমি নাকি মানুষের বাড়িতে গিয়ে ভাত খাই। ওসি’র কি ভাতের অভাব পড়েছে মানুষের বাড়িতে গিয়ে খেতে হবে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, ব্রিক ফিল্ড থেকে টাকা নেয় এবং করাপটেড অফিসার ইত্যাদি অভিযোগ করেন। হাওরে সব ইটভাটা পানির নিচে। উনি ব্যক্তি নিরাপত্তা দাবি করেছিলেন। পূজার সময় সেটা দেয়া সম্ভব ছিল না।
এদিকে, এ ঘটনার পর মনজুর কাদের ভূঁইয়ার আগের স্টেশন চকোরিয়ায় তার বিরুদ্ধে হত্যা, সাংবাদিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাকে সে সময় প্রত্যাহারের নির্দেশও দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রাতে ওসি এ বিষয়ে জিডি করেছেন। মামলাও প্রক্রিয়াধীন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
