রেমিট্যান্স নেয় রাষ্ট্র, জীবনের দায় নেবে কে?

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

রেমিট্যান্স নেয় রাষ্ট্র, জীবনের দায় নেবে কে?

ফন্ট সাইজ:

সন্তান, পরিবার আর দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে তারা পাড়ি জমান হাজার মাইল দূরে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে কাটান প্রবাসের কঠিন দিন। ঘাম ঝরান, কষ্ট সহ্য করেন, আপনজনদের ভালো রাখার আশায়। অথচ বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়লে তাদের পাশে দাঁড়াবে কে? রাষ্ট্র কি শুধু তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব রাখবে, নাকি তাদের জীবনের দায়ও নেবে? যাদের ঘামে সমৃদ্ধ হয় দেশের অর্থনীতি, বিদেশের মাটিতে তাদের জীবন কি এতটাই অসহায়? এ কেমন নিয়তি! সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা আজ সেই বেদনাবিধুর প্রশ্নই সামনে এনেছে।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম বাসির ও সুইটি (সিতি) আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর প্রশ্নগুলো আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত ১৬ অক্টোবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঘটনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তার কেন্দ্রে শুধু দু’টি মৃত্যুর ঘটনা নেই, আছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কূটনৈতিক যোগাযোগ, কনস্যুলার সেবার কার্যকারিতা এবং বিদেশে বিপদগ্রস্ত নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত পরিণতির আগে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ কী জানত, কখন জানত এবং জানার পর কী করেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি। কারণ, বিদেশে একজন নাগরিকের বিচার হওয়া সেই দেশের সার্বভৌম বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয় হলেও তার নাগরিক অধিকার, আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নে নিজ দেশের কূটনৈতিক ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে না। এখানে আবেগ আছে, কিন্তু শুধু আবেগ দিয়ে এই ঘটনার বিচার করা যাবে না। দরকার তথ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

তালিকায় নাম ছিল, মৃত্যুদণ্ডের খবর ছিল না কেন? এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি লুকিয়ে আছে একটি তারিখে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি গোপনীয় স্মারকলিপি অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই দিন বন্দিদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেখানে নজরুল ইসলাম বাসির ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। নজরুলের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগ এবং সুইটির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও তাদের দণ্ডের বিবরণ ছিল না। স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ১৪ অক্টোবর তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

বন্দিদের তালিকায় নাম থাকা মানেই যে মৃত্যুদণ্ডের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে, তা নয়। আবার সাজার তথ্য নেই বলে বিষয়টি আর খতিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল না, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। গুরুতর অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আটক দুজন বাংলাদেশির নাম যখন সরকারি তালিকায় এসেছে, তখন তাদের মামলার বর্তমান অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছিল কি না, সেটিই এখন অনুসন্ধানের বিষয়।

কনস্যুলেট কি সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিল, তাদের বিচার কোন পর্যায়ে? আদালত কোনো রায় দিয়েছেন কি না? তারা আইনজীবী পেয়েছেন কি না? আপিলের সুযোগ ছিল কি না? মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজা হলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ফলে একদিকে যেমন সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মিশনের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কোনো পক্ষের ব্যাখ্যা যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু দায়িত্ব পালনের প্রমাণ চাওয়া অন্যায় নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার বিস্তারিত বিবরণ ও বিচারপ্রক্রিয়ার তথ্য চেয়েছে। ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তোলা হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনার পর কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি তাড়া করে, সেটি হলো—এই উদ্যোগগুলো কি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই নেওয়া সম্ভব ছিল?

কূটনীতির সাফল্য শুধু ঘটনার পর প্রতিবাদপত্র পাঠানোয় নয়। কখনো কখনো সাফল্য নির্ভর করে এমন একটি পদক্ষেপে, যা একটি জীবন বাঁচানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রের কাছে সুইটির জীবন কি শুধু একটি পরিসংখ্যান? সুইটি আক্তারের জীবনের দিকে তাকালে প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের অসহায়ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দরিদ্র পরিবারের পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট সুইটি। অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তার। সেই সংসার টেকেনি। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ফিরে এসেছিলেন বাবার বাড়িতে। পরে দ্বিতীয় বিয়ে করলেও স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে পরিবারের ভাষ্য। সংসারের অভাব আর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত নিজেই পাড়ি জমান সৌদি আরবে।

সুইটির বাবা মো. ফজল মিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরবে যান তার মেয়ে। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম কয়েক মাস পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও পরে একদিন ফোন করে কারাগারে বন্দি থাকার কথা জানান। এরপর কখনো এক সপ্তাহ, কখনো এক মাস বিরতিতে কথা হতো। একপর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পরিবার জানতে পারে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে। একবার ভাবুন, একটি পরিবারের জন্য এই খবরের অর্থ কী।

যে বাবা ধারদেনা করে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, তার কাছে সৌদি আরব ছিল দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সম্ভাবনা। যে মা মেয়ের ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন, তার কাছে বিদেশ মানে ছিল দূরে থেকেও বেঁচে থাকার আশ্বাস। যে শিশুটি মায়ের অনুপস্থিতিতে বড় হচ্ছে, তার কাছে এই অনুপস্থিতির অর্থ এখন আরও নির্মম।

তবে সুইটির ব্যক্তিগত জীবন বা পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা কিংবা অসত্যতা প্রমাণ করে না। একইভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়াও ন্যায়বিচার নয়। অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দরিদ্র বলে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন; আবার দরিদ্র বলে কেউ আইনি সুরক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন না।

সুইটির নয় বছরের মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় তাই শুধু শোক প্রকাশ করলেই দায় শেষ হয় না। তার মায়ের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, আদালত কী প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল কি না? এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা জরুরি। একই প্রশ্ন নজরুল ইসলাম বাসিরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, একটি মৃত্যুদণ্ডের পরও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় শেষ হয়ে যায় না।

বিচারপ্রক্রিয়া হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ জানল না কেন? সৌদি আরবের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের পর দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষ সেই রায় বহাল রাখেন। পরে রাজকীয় আদেশে ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমত, সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় কোনো মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে বাংলাদেশের সব প্রশ্নের অবসান ঘটে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মিশনকে আগে জানানো হয়নি—এমন দাবি সত্য হলে সেটি গুরুতর কূটনৈতিক উদ্বেগের বিষয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কী ধরনের নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট আইনগত বিধান ও দুই দেশের যোগাযোগের নথি পরীক্ষা করা দরকার।

বাংলাদেশের কনস্যুলেটের বক্তব্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা কোনো বিজ্ঞপ্তি পায়নি। অন্যদিকে, বন্দিদের তালিকায় দুই বাংলাদেশির নাম ছিল। এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: বন্দিদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তাদের মামলার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে বাংলাদেশ কেন জানতে পারল না?

আরও একটি অসংগতি রয়েছে। কনস্যুলেটের স্মারকলিপিতে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণ হিসেবে তার চেয়ে ভিন্নভাবে একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উল্লেখ করেছে। এই দুই বর্ণনার মধ্যে সম্পর্ক কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাই অনুমান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে পূর্ণাঙ্গ রায় ও মামলার নথি সংগ্রহ করা জরুরি।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অপরাধের প্রতি সমর্থন নয়। বরং আইনের শাসনের স্বার্থেই প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো করা দরকার।

জেদ্দা কনস্যুলেটের স্মারকলিপি অনুযায়ী, নজরুল ও সুইটির পরিবার আইনি সহায়তার জন্য কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এই তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, বিদেশে আটক ব্যক্তির পরিবার যোগাযোগ করলে অনেক ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা, আইনজীবীর সন্ধান কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া সহজ হয়।

বিদেশে আটক ব্যক্তির পরিবারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন বোঝা, আইনজীবী নিয়োগ করা, কূটনৈতিক যোগাযোগের পদ্ধতি জানা কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি অনুধাবন করা সব সময় সম্ভব হয় না। প্রবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ সীমিত আয়ের মানুষ। তাদের পরিবারের অনেকেই জানেন না, বিদেশে কেউ গ্রেপ্তার হলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে আইনি সহায়তা চাইতে হবে কিংবা কোন পর্যায়ে দূতাবাসের হস্তক্ষেপ কামনা করা যায়। এ কারণেই কনস্যুলার সেবার গুরুত্ব।

অবশ্য দূতাবাস বা কনস্যুলেট বিদেশি আদালতের রায় বাতিল করতে পারে না। কোনো অপরাধে অভিযুক্ত নাগরিককে বিনা শর্তে মুক্ত করে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের নেই। কিন্তু আটক নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করা, পরিবারকে যোগাযোগের পথ দেখানো, আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে তথ্য দেওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা এবং গুরুতর ঝুঁকির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা—এসব ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা থাকতে পারে।

তাহলে নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে কী করা হয়েছিল? তাদের আটকের পর বাংলাদেশের মিশন কি কোনো খোঁজ নিয়েছিল? বন্দিদের তালিকা পাওয়ার পর কি সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়েছিল? তাদের মৃত্যুদণ্ডের কথা জানার কোনো সুযোগ কি ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বের করতে হবে। কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত করাও যুক্তিসংগত নয়।

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর নিরাপত্তার হিসাব কোথায়? বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। লাখ লাখ পরিবার এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবারের শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রবাসীকে শুধু অর্থ পাঠানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখলে তার প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের মূল বিষয়টিই হারিয়ে যায়।

একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার সময় নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, অভিবাসন ব্যয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হন। বিদেশে পৌঁছানোর পর তার নিরাপত্তা নির্ভর করে কর্মপরিবেশ, স্থানীয় আইন, নিয়োগকর্তা এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা পাওয়ার ওপর। গ্রেপ্তার হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, অর্থের অভাব এবং স্থানীয় বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা তাকে দুর্বল অবস্থানে ফেলতে পারে।
তাই প্রবাসীকল্যাণ মানে শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানো নয়; বিদেশে বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে তোলা।

সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশির বসবাস ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। দুই দেশের সম্পর্কের পরিধি শুধু শ্রমবাজার বা অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সেখানে নাগরিকের নিরাপত্তা, বন্দিদের বিষয়ে তথ্য বিনিময় এবং আইনি সহায়তার প্রশ্নও থাকতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের বন্দি হস্তান্তর চুক্তি নেই বলে সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য এসেছে, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে। তবে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি এবং মৃত্যুদণ্ডের আগে কনস্যুলার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয় দুটি এক নয়। একটি চুক্তি থাকলেই মৃত্যুদণ্ড ঠেকানো যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে বিচারিক সহযোগিতা, বন্দিদের তথ্য বিনিময় এবং আইনি সহায়তা নিয়ে কার্যকর সমঝোতা থাকলে যোগাযোগের প্রাতিষ্ঠানিক পথ আরও সুস্পষ্ট হতে পারে।

এখন দরকার রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কার্যকর উদ্যোগ। সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের একটি হালনাগাদ তথ্যভান্ডার, গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলার অগ্রগতি অনুসরণের ব্যবস্থা, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বন্দিদের জন্য বিশেষ কনস্যুলার প্রটোকল এবং পরিবারকে দ্রুত অবহিত করার পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে।

এ কাজে দূতাবাস, কনস্যুলেট, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্বের বিভাজন স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কোন দপ্তর কখন তথ্য পাবে, কে মামলার অগ্রগতি অনুসরণ করবে এবং কোন পরিস্থিতিতে জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে লিখিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত।

নজরুল ইসলাম বাসির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশের সামনে অন্তত চারটি জরুরি কাজ রয়েছে।

প্রথমত, সৌদি আরবের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ রায়, অভিযোগের বিবরণ, প্রমাণের ভিত্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নথি সংগ্রহ করতে হবে। তারা আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, আপিলের সুযোগ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বাংলাদেশের মিশনকে কখনো কোনো তথ্য জানানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ৩০ সেপ্টেম্বর পাওয়া বন্দিদের তালিকা নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক পর্যালোচনা হওয়া দরকার। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কেন মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি, কিংবা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়ে থাকলে তার ফল কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিসহ প্রকাশ করা উচিত।

তৃতীয়ত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে হবে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের মিশনকে কেন অবহিত করা হয়নি। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বন্দিদের তথ্য বিনিময় এবং আইনি সহযোগিতার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

চতুর্থত, বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য সহজ যোগাযোগব্যবস্থা চালু করতে হবে। জরুরি হটলাইন, অনলাইন অভিযোগ গ্রহণ, আইনি সহায়তা সম্পর্কে বাংলা ভাষায় নির্দেশনা এবং গুরুতর মামলার নিয়মিত অনুসরণ-এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয়। বরং এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকের দেশে এ ধরনের ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।

এখানে কাউকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো, যে ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন নাগরিকের বিপদের খবর রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানোর কথা, সেখানে কোথায় ঘাটতি ছিল তা খুঁজে বের করা। কারণ, রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল নাগরিকের পাঠানো অর্থ গ্রহণ করা নয়; বিপদের সময় তার পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করাও।

নজরুল ও সুইটি আর ফিরে আসবেন না। তাদের পরিবার যে শূন্যতার মুখোমুখি হয়েছে, কোনো কূটনৈতিক পত্র কিংবা সরকারি বিবৃতি সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যুর ঘটনাটি যদি প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষাব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আনে, যদি ভবিষ্যতে কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে না হয়, তবে অন্তত এই মর্মান্তিক ঘটনার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে কিছু অগ্রগতি ঘটবে।

প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয়, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো কেন, কিংবা বাংলাদেশ আগে জানল না কেন।

প্রশ্নটি আরও গভীর: বিদেশে একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিপদের মুখে পড়লে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটা? রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান আমরা স্বীকার করি। তাদের পাঠানো অর্থকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করি। এখন তাদের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। 

রেমিট্যান্সের হিসাব রাষ্ট্র রাখবে, অথচ রেমিট্যান্স যোদ্ধার বিপদের হিসাব রাখবে না—এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এ কেমন নিয়তি? নাকি এমন একটি ব্যবস্থার দুর্বলতা, যা সংশোধন করা আমাদেরই দায়িত্ব? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিবৃতিতে নয়, তদন্তে, জবাবদিহিতে এবং কার্যকর পরিবর্তনে দিতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]