মঙ্গলবার ছুটির দিনে রংপুরের এক জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য সম্প্রতি বেশ ভাবিয়ে তুলেছে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন—গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি গভীর চক্রান্ত সক্রিয় রয়েছে। তার এই মন্তব্যের পরপরই সারা দেশে একধরনের উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগের পটভূমি কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বা রাজনৈতিক বক্তব্য নয় ; সাম্প্রতিক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের মনেও এ প্রশ্ন উঠতে বাধ্য—এগুলো কি কেবলই বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি দেশের ভেতরে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত?
আগুনের ছাইয়ে অর্থনৈতিক অবকাঠামো: কাকতালীয় নাকি চক্রান্ত?
গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একের পর এক ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এরপরই পর্যটন নগরী কক্সবাজারের একটি নবনির্মিত রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন পর্যটক, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। মঙ্গলবার বিকালেই খবরের শিরোনাম হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ড। এক বছর আগেও দেশের প্রধান এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এক ভয়াবহ আগুনে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছিল।
গত ১৪ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যদেরও কাজ করতে হয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁচামাল পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচামালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, ভ্যাকসিন, হরমোন, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের ওষুধ তৈরির উপাদান ছিল বলে জানানো হয়েছে।
এর মাত্র তিন দিন পর, ১৭ অক্টোবর, গাজীপুরের সফিপুরে দি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির ন্যাচারাল মেডিসিন সেকশনের গুদামে আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। দুটি ঘটনাই ওষুধশিল্পের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ, এগুলো সাধারণ গুদাম বা অস্থায়ী স্থাপনা নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষায়িত উৎপাদনব্যবস্থা, পরীক্ষাগার, আমদানি করা যন্ত্রপাতি এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ক্ষতি শুধু ভবন বা যন্ত্রপাতির দামে মাপা যায় না। উৎপাদন পুনরায় চালু করা, কাঁচামাল সংগ্রহ, মান যাচাই এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতেও সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনমুখী খাত। দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদেশেও ওষুধ রপ্তানি করে। দেশের রপ্তানিমুখী এসব প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের বাজারে পণ্য সরবরাহ করে। এই শিল্পের সুনাম গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের মাধ্যমে। কোনো প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগলে তার তাৎক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ পূরণ, সরবরাহের সময়সূচি এবং ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। দুটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশের ওষুধ সরবরাহ বা রপ্তানি কতটা ব্যাহত হয়েছে, তা অবশ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সমিতির যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
এই ঘটনাগুলোর টাইমিং বা সময় নির্বাচন সচেতন মহলকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলছে। ওষুধ কারখানায় একের পর এক আগুন লাগার ঠিক দু’সপ্তাহ আগেই সতর্কবার্তা ছিল যে, দেশের উদীয়মান ওষুধ শিল্পে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে। কাকতালীয়ভাবে, এর কিছুদিন পরই ঘোষণা আসে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানিতে শুল্ক বা ডিউটি প্রত্যাহার করেছে। অর্থাৎ, শূন্য শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের মতো ওষুধ রপ্তানির এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে। তাই আমার উদ্বেগের জায়গাটি বেশ গভীরে। আমি এ ঘটনাগুলোকে ষড়যন্ত্র এবং সম্ভাব্য অন্তর্ঘাতের দৃষ্টিতেও তদন্ত করার পক্ষে।
অপরাধতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির আলোকে দেখলে, কোনো একটি প্রতিযোগী দেশের জন্য এই সাফল্য নিশ্চিতভাবেই ব্যবসায়িক দিক থেকে এক বড় ধাক্কা। ফলে বাংলাদেশের ওষুধ খাতকে অস্থির ও অনিরাপদ প্রমাণের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে এর সুনাম নষ্ট করতে একটি সুনির্দিষ্ট পক্ষ কাজ করবে—এমন সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একই হিসাব খাটে পর্যটন খাতের ক্ষেত্রেও। দেশে এখন প্রচুর মানুষ ছুটির দিনে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এর ফলে দেশের টাকা যেমন দেশে থাকছে, তেমনই অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই যারা বিদেশি পর্যটক ও দেশীয় রেমিট্যান্স নিজেদের দিকে টানতে অভ্যস্ত, তাদের ব্যবসায় প্রভাব পড়ছে। হোটেলে বা রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় যদি বিপুল প্রাণহানি ঘটে, তবে তা কেবল একটি স্থাপনা পোড়ায় না, বরং গোটা পর্যটন খাতেই এক ধরনের আতঙ্ক ও ধস নামিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা ও অস্থিতিশীলতার ছক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, ফ্যাসিবাদের পতনের পর যখন কোনো শাসক বা দল ক্ষমতার মসনদ হারিয়ে দেশ ছেড়ে পালায়, তখন রাজনৈতিকভাবে তাদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। উচ্চ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা আন্তর্জাতিক কোনো 'রেজিম চেঞ্জ' (শাসন পরিবর্তন) ছাড়া এভাবে ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে গিয়ে স্বদেশে ফেরা অতীত ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায়নি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফিরছেন—এমন একটি খবর নিয়ে হালে বেশ চর্চা ও 'হাইপ' তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বলে, এই মুহূর্তে তার দেশে ফেরাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে এমন হাইপ বা গুঞ্জন কেন তোলা হচ্ছে?
কেউ কেউ বলছেন, এখানেই লুকিয়ে থাকতে পারে কৌশল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির দেশের ভেতরে থাকা এবং প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার নেতাকর্মীর একটি বড় অংশ বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক ও অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে- এমন খবর রয়েছে। তাদের স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ অনেকটাই কঠিন, আবার বিদেশে অনির্দিষ্টকাল থাকা ও খাওয়ার সংস্থান করাও দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে ও বাঁচিয়ে রাখতে তাদের একটি আশার আলো বা পরিবেশ প্রয়োজন।
নেত্রী ফিরছেন—এমন মনস্তাত্ত্বিক উদ্দীপনা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
অপরাধতত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অন্তর্ঘাত (Sabotage)
অপরাধতত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অন্তর্ঘাত বা 'স্যাবোটেজ'-কে বলা হয় শত্রুকে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়ার সবচেয়ে আধুনিক ও বিপজ্জনক অস্ত্র। অপরাধবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন শক্ত অবস্থানে থাকে, তখন সরাসরি আক্রমণ না করে অর্থনৈতিক অবকাঠামো, কেপিআই, এবং জননিরাপত্তায় আঘাত হানা হয়।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো তিনটি:
মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি: সাধারণ মানুষের মনে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে অনাস্থা ও ভীতি তৈরি করা।
অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভাঙা: ওষুধ, পর্যটন বা রপ্তানিমুখী খাতের মতো মূল চালিকাশক্তিগুলোতে আগুন বা ভাঙচুরের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাধা দেওয়া।
প্রশাসনের মনোযোগ অন্যদিকে রাখা: একের পর এক অগ্নিদুর্ঘটনা ও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারের প্রশাসনিক দৃষ্টি মূল সংস্কারমূলক কাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া।
প্রতিকারের পথ: তদারকি ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা
অস্থিতিশীলতা ও অন্তর্ঘাত রোধে কেবল বিবৃতি বা শঙ্কা প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো প্রশাসনিক এলাকায় ষড়যন্ত্র কিংবা অন্তর্ঘাতের ছক নস্যাৎ করার সবচেয়ে কার্যকারী উপায় হলো—'দৃশ্যমান উপস্থিতি ও কড়া নজরদারি' (Visible Surveillance and Movement)। যেখানে প্রশাসনিক মুভমেন্ট বেশি থাকে, সেখানে অন্তর্ঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ কমে যায়।
এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারে নিম্নোক্ত পদক্ষেপে হাঁটা জরুরি:
বিশেষ তদারকি ও নির্দেশিকা: জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে প্রতিটি এলাকার বড় বড় শিল্পকারখানা, কেপিআই (Key Point Installtion) ভেন্যু এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো চিহ্নিত করতে হবে। বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে পরিদর্শন করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ-বহির্গমন, কর্মচারীদের পরিচয়পত্র (ID Card), অভ্যাগতদের চলাচল, কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন ও জনবল ব্যবস্থাপনা কড়া রিভিউয়ের আওতায় আনতে হবে।
সমন্বিত স্টিয়ারিং কমিটি: এসব কাজে কেবল একক কোনো বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে জেলা পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি তৈরি করা প্রয়োজন। এতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এনএসআই, ডিজিএফআই, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, সেনাকমান্ডের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
স্পেশাল সারভাইলেন্স: কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন (Surprise Inspection) বাড়াতে হবে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সরজমিনে উপস্থিতি যেকোনো সম্ভাব্য অন্তর্ঘাতকের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেয়।
পরিশেষে, বর্তমান সময়টি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এই সন্ধিক্ষণে ধারাবাহিক অগ্নিদুর্ঘটনা ও নাশকতামূলক প্রবণতাকে কেবল দুর্ঘটনা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক কঠোরতা, আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সার্বিক নজরদারির মাধ্যমেই কেবল এই সম্ভাব্য চক্রান্ত মোকাবিলা করা সম্ভব।
____
লেখক : সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব
বিশ্লেষণ
ষড়যন্ত্র নাকি অন্তর্ঘাত: রাষ্ট্রযন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো রক্ষায় জরুরি করণীয়
শামসুল আলম
মত-মতান্তর
২ ঘন্টা আগে
২১ অক্টোবর (বুধবার), ২০২৬, ৯ঃ৩৯ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
