আমদানি বিল, ঋণ পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য জরুরি

আমদানি বিল, ঋণ পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য জরুরি

ফন্ট সাইজ:

প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অথচ আমদানি বিল পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি এবং ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা ঘিরে পুরোপুরি কাটছে না উদ্বেগ। এর কারণ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কি পরিমাণ ডলার আসছে সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কত ডলার কখন প্রয়োজন হচ্ছে এবং কোন পথে তা আসছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তিতে রূপ দিতে হলে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য, ঋণ পরিশোধ, হুন্ডি প্রতিরোধ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের জোগান নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ১৭.৩ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ১১৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার বেশি। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৮৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ছিল সামান্য। ফলে পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭২৮ কোটি ডলারে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের এই সমীকরণ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে আমদানি দায়, বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ এবং বাজারের প্রত্যাশার বিষয়টি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্যের উন্নতি পরিস্থিতিকে আগের তুলনায় শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬৩৯ কোটি ডলার; আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে তা ৩১৫৮ কোটি ডলার।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, রিজার্ভ বেড়ে ৩৬.৫৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং চলতি বছরের মার্চে দেশে রেকর্ড ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। তবে রিজার্ভ বাড়া এবং বাজারে প্রতিটি ব্যাংকের প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত ডলার পাওয়া, দুটি আলাদা বিষয়। রিজার্ভ দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক সম্পদের অবস্থান নির্দেশ করে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডলারের তারল্য নির্ভর করে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স নিষ্পত্তি, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং আমদানি ও ঋণ পরিশোধের সময়সূচির ওপর। তিনি বলেন, ডলারের যোগান বাড়াতে হলে রেমিট্যান্স আহরণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকায় দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে হবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে দক্ষ কর্মী নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইতালি সরকার। এ লক্ষ্যে আগামী মাসে একটি বিশেষ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দেশটি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের ইতালিতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ইতালির ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দক্ষ জনশক্তি পাঠানো নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের এই বৈপরীত্যের পরিমাণগত দিকটি উঠে এসেছে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫২৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ আমদানি ব্যয়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধির পরিমাণ রেমিট্যান্সের বাড়তি আয়ের চেয়ে প্রায় ১৫৫ কোটি ডলার বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমদানি বৃদ্ধির কারণে ঠিক ১৫৫ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কারণ, রেমিট্যান্সের সব অর্থ আমদানি পরিশোধে ব্যবহৃত হয় না। একইভাবে আমদানির সব দায়ও একই সময়ে নগদ ডলারে পরিশোধ করতে হয় না। ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির সময়, বাণিজ্যঋণ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের ওপরও ডলারের চাহিদা নির্ভর করে। সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় আগের অর্থবছরের প্রায় ৮৫৭ কোটি ডলার থেকে কমে ৮০৭ কোটি ডলারে নেমেছে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ ৪০৯ কোটি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৪৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিদেশি সহায়তা থেকে ঋণ পরিশোধ বাদ দিয়ে নিট অর্থপ্রবাহ ৪৪৮ কোটি ডলার থেকে কমে ৩৫৮ কোটি ডলারে নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। রপ্তানি আয়, সেবা খাতের লেনদেন, বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগ এবং আর্থিক হিসাবের অর্থপ্রবাহও বিবেচনায় নিতে হবে। সাকিফ শামীম বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও ব্যবহারের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই সূচকগুলোকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

অন্যদিকে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন ডলারের বাজার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়বে এবং ডলারের দামেও তার প্রভাব আসতে পারে। তবে তিনি ব্যাংকগুলোতে ডলারের পর্যাপ্ততার কথা উল্লেখ করে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলেও মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ডলারের দাম বাড়ার আশঙ্কা এবং বাজারে তাৎক্ষণিক ডলারের ঘাটতি-দুটি এক বিষয় নয়। ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত ডলার থাকলেও আমদানি দায় পরিশোধের সময়সূচি, ব্যাংকগুলোর ডলার ধরে রাখার প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ বিনিময় হার নিয়ে প্রত্যাশার কারণে বাজারে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমেয়তা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈধ আমদানি-রপ্তানিতে অপ্রয়োজনীয় বাধা না দিয়ে সন্দেহজনক লেনদেনের মূল্য যাচাই জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবাসীদের জন্য আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানো সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে হবে। চতুর্থত, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ৫ বা ১০ শতাংশ কমলে, আমদানি ব্যয় বাড়লে কিংবা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পেলে রিজার্ভ ও ব্যাংকের ডলারের তারল্যে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের জন্য বড় অর্জন। তবে এই অর্জনের সুফল ধরে রাখতে শুধু রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক দায়, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই প্রবাসী আয়ের সাফল্য সাময়িক স্বস্তির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারবে।

সিএসইআর’র বিশ্লেষণ
সিএসইআর চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম তার "রেমিট্যান্স বাড়ছে, তবু ডলারের বাজারে চাপ কেন"? শীর্ষক আর্টিকেলে বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখন এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে প্রবাসী আয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক দায় পরিশোধ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের জোগান নিশ্চিত করার চাপ রয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৩ শতাংশ বেশি। অথচ একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০.৫ শতাংশ, রপ্তানি আয় প্রায় স্থবির থেকেছে এবং পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭২৮ কোটি ডলারে। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস থেকে আয় বাড়লেও অন্যদিকে ব্যয়ের চাপ আরও দ্রুত বাড়ছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ-এর বিশ্লেষণে সাকিফ শামীম জানান, এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা প্রয়োজন- রেমিট্যান্স বাড়া এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি ফিরে আসা একই বিষয় নয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান নির্ভর করে রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার অর্থপ্রবাহ, ঋণ পরিশোধ, সেবা খাতের লেনদেন এবং মূলধনের আন্তঃসীমান্ত প্রবাহের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যাংকিং ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হারের ব্যবধান এবং ভবিষ্যৎ ডলারের জোগান নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছে প্রায় ৮৫৯ কোটি ডলার। তবে মাসভিত্তিক প্রবাহে ওঠানামা রয়েছে। জুলাইয়ে এসেছে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার, আগস্টে ২৯৭ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও মাসিক অঙ্কে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়নি। সেপ্টেম্বরের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কত ছিল, তা নির্ধারণে একই সংজ্ঞা ও সময়সীমার তুলনামূলক তথ্য ব্যবহার করা জরুরি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ১১৪ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার বেশি। একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৮৫ কোটি ডলার, আগের বছরের তুলনায় প্রায় স্থবির। ফলে পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৭২৮ কোটি ডলারে। এখন রেমিট্যান্স ও আমদানির পরিবর্তন পাশাপাশি রাখলে চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫২৫ কোটি ডলার, অথচ আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ আমদানি ব্যয়ের বার্ষিক বৃদ্ধির পরিমাণ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির চেয়ে প্রায় ১৫৫ কোটি ডলার বেশি।

এই হিসাবের অর্থ এই নয় যে আমদানি বৃদ্ধির কারণেই ঠিক ১৫৫ কোটি ডলারের বাজারচাপ তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্সের পুরো অর্থ আমদানি পরিশোধে ব্যবহৃত হয় না, আবার আমদানির সব অর্থও একই সময়ে নগদ ডলার হিসেবে পরিশোধিত হয় না। ঋণপত্র খোলা, নিষ্পত্তি, বাণিজ্যঋণ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের সময়ের পার্থক্য রয়েছে। তবে এই তুলনা দেখায়, রেমিট্যান্সের বাড়তি প্রবাহ আমদানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি।
বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের অন্য উৎসগুলোতেও চাপ রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় কমে প্রায় ৮০৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল প্রায় ৮৫৭ কোটি ডলার। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ বেড়ে প্রায় ৪৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল প্রায় ৪০৯ কোটি ডলার। ফলে নিট বিদেশি অর্থপ্রবাহ প্রায় ৪৪৮ কোটি ডলার থেকে কমে ৩৫৮ কোটি ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এই উৎস থেকে নিট প্রবাহ কমেছে প্রায় ৯০ কোটি ডলার।
এই পরিসংখ্যানগুলো একসঙ্গে করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, আমদানি ব্যয়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার, আর নিট বিদেশি অর্থপ্রবাহ কমেছে প্রায় ৯০ কোটি ডলার। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫২৫ কোটি ডলার। রপ্তানি আয় প্রায় স্থবির থাকায় নতুন কোনো বড় বৈদেশিক মুদ্রার উৎসও তৈরি হয়নি। এই তিনটি পরিবর্তনকে একত্রে দেখলে বোঝা যায়, রেমিট্যান্সের বাড়তি প্রবাহের বিপরীতে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি, নিট বিদেশি অর্থপ্রবাহের পতন এবং রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপের সম্পূর্ণ পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য চলতি হিসাব, আর্থিক হিসাব, ঋণপত্রের প্রকৃত নিষ্পত্তি, সেবা ও আয় খাতের লেনদেন এবং রিজার্ভের পরিবর্তনসহ পূর্ণাঙ্গ পরিশোধ ভারসাম্যের হিসাব প্রয়োজন। উপরোক্ত তুলনা তাই একটি পরিমাণগত ব্যাখ্যা, বাজারচাপের পূর্ণাঙ্গ কারণভিত্তিক বিভাজন নয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থানও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬১৫ কোটি ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ১৩০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
কিন্তু রিজার্ভ বাড়লেই ব্যাংকগুলোর প্রতিটি আমদানি দায় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত ডলার সব সময় সহজে পাওয়া যাবে, এমন নয়। রিজার্ভ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক বৈদেশিক সম্পদের অবস্থান নির্দেশ করে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডলারের জোগান নির্ভর করে তাদের কাছে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্সের নিষ্পত্তি, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং গ্রাহকদের বৈদেশিক দায়ের সময়সূচির ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত বিনিময় হারেও দেখা যায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ডলারের লেনদেনমূল্য ১২৩ টাকার আশপাশে ছিল। এই হারকে এককভাবে বাজারে চাপের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। তবে আমদানির চাহিদা, ব্যাংকের তারল্য এবং বৈদেশিক দায়ের সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে এটি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। অর্থাৎ রিজার্ভের উন্নতি বাংলাদেশের বৈদেশিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক দায়ের প্রবাহের সঙ্গে ডলারের জোগানের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এখনো জরুরি।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, ঋণ পরিশোধ, আর্থিক হিসাব এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের ঝুঁকি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান পরিসংখ্যান দেখায়, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি রেমিট্যান্সের বাড়তি প্রবাহকে ছাড়িয়ে গেছে এবং নিট বিদেশি অর্থপ্রবাহও কমেছে। ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সে শ্লথগতি বা আমদানি ব্যয়ের নতুন উল্লম্ফন ঘটলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।

তাই নীতিনির্ধারণের লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও ব্যবহারের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বৈধ লেনদেনকে সহজ, অনিয়মকে কঠিন এবং বৈদেশিক অর্থপ্রবাহকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে। রেমিট্যান্সের সাফল্য তখনই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে, যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থা শুধু বর্তমান প্রবাহের ওপর নির্ভর করবে না, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করবে।