বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সম্পর্ককে শুধু ঋণ নেওয়া বা না নেওয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, সরকারি ব্যয়, বৈদেশিক অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা না হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে একটি চ্যালেঞ্জ এবং একটি সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্য হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনেই এই সম্পর্কের সূচনা। পরবর্তী পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, শিল্প ও রপ্তানি সম্প্রসারিত হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতাও বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ দুর্বল রয়ে গেছে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতিকে অস্থির করেছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছিল বর্ধিত ঋণ ও অর্থায়ন সুবিধার আওতায় এবং প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছিল জলবায়ু ও স্থিতিশীলতা-সম্পর্কিত অর্থায়ন। পরবর্তী সময়ে এই কর্মসূচির পরিমাণও বাড়ানো হয়। ২০২৬ সালে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মূল কারণও ছিল বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বারবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন কেন তৈরি হয়? এর উত্তর শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির মধ্যে খুঁজলে চলবে না। বাংলাদেশের কর-রাজস্বের পরিমাণ অর্থনীতির তুলনায় এখনও কম। সরকারি ব্যয়ের একটি অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায়। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল অর্থ আটকে আছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ অর্থনীতিতে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে সাময়িকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে তা দ্রুত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আস্থার সংকেত। একটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচিতে যায়, তখন অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে নতুন করে নজর দেয়। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান সরাসরি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্দেশে পরিচালিত না হলেও একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তাদের অর্থায়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানেই অন্য সব বৈদেশিক অর্থায়নের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, কিন্তু এর ফলে আন্তর্জাতিক আস্থার পরিবেশে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কোনো দেশের উন্নয়নের বিকল্প নয়। ঋণ নিয়ে সাময়িক বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না শুধু ঋণের অর্থ দিয়ে। এসব সংস্কার একটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো এর শর্ত। রাজস্ব বাড়ানো, করব্যবস্থায় পরিবর্তন, ভর্তুকি কমানো, মুদ্রা বিনিময় হার সংস্কার, সুদের হার ও মুদ্রানীতি পরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতির সময়ে কর বা জ্বালানি ব্যয় বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক সংস্কার অনেক সময় রাজনৈতিক সংস্কারের চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে। জনগণের কাছে এর ব্যাখ্যা দেওয়া এবং এর বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল নিজেও এখন তার পুরোনো পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচির নকশা ও শর্তসংক্রান্ত মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবসম্মত, দেশভিত্তিক, সংশ্লিষ্ট দেশের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনাসম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত সংখ্যক সংস্কারের পরিবর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।
এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সব শর্ত অন্ধভাবে মেনে নেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি সব শর্তকে দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখাও বাস্তবসম্মত নয়। যে সংস্কার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে, তা নিজের প্রয়োজনেই গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু কোন সংস্কার কখন এবং কী গতিতে করা হবে, তার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা, সামাজিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনের আলোতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ঋণ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেনি; বরং ঋণ লেনদেনে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এমন ঋণ গ্রহণ, যার ব্যবহার উৎপাদনশীল নয় এবং যার বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হবে, তা দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও জনগণের সম্পদ একটি আমানত। সুতরাং সরকারি ব্যয়ে অপচয়, দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কিংবা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কেবল ঘাটতি পূরণের জন্য ক্রমাগত বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাও টেকসই হতে পারে না।
ঋণ নেওয়া হয়েছে কি না—এটি একমাত্র প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, ঋণ কেন নেওয়া হয়েছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে, সেই অর্থ অর্থনীতিতে কী উৎপাদন সৃষ্টি করেছে এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা তৈরি হয়েছে। উৎপাদনশীল অবকাঠামো, শিল্প, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগের জন্য নেওয়া ঋণের যৌক্তিকতা এক রকম; আর নিয়মিত রাজস্ব ঘাটতি বা অনুৎপাদনশীল ব্যয় মেটাতে ধার করার যৌক্তিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গ্রিস, আর্জেন্টিনা কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়। গ্রিসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা কর্মসূচি অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিকভাবে ধস থেকে রক্ষা করলেও কঠোর ব্যয়সংকোচনের সামাজিক মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি। আর্জেন্টিনা বহুবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচিতে গিয়েও স্থায়ী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি; সেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এবং বহিরাগত আঘাত বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাপক সংস্কার করে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ নিজে সফলতা বা ব্যর্থতার নিশ্চয়তা নয়; আসল বিষয় হলো একটি দেশ সেই অর্থ ও সংস্কারকে কীভাবে ব্যবহার করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এতে সরকার সংস্কারের গতি ও ক্রম নির্ধারণে কিছুটা বেশি স্বাধীনতা পেতে পারে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের মধ্যে এমন কিছু সংস্কার ধাপে ধাপে করার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেগুলোর আকস্মিক বাস্তবায়ন সাধারণ মানুষের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করত। বিশেষ করে রাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে সাধারণ ভোক্তার ওপর করের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, বড় করদাতাদের কাছ থেকে ন্যায্য রাজস্ব আদায় এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো বেশি কার্যকর হতে পারে। ন্যায়ভিত্তিক রাজস্বব্যবস্থার সঙ্গে এ পথটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একইভাবে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক দায়িত্ব। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ও দুর্বল তদারকি দূর করা বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন। জনগণের আমানত রক্ষা করাও এক ধরনের আমানতদারির দায়িত্ব।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়া মানেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া নয়। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের চাপ আবারও সামনে আসতে পারে। তখন সরকারকে বেশি মাত্রায় অভ্যন্তরীণ ঋণ নিতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে। বৈদেশিক অর্থায়ন কঠিন হলে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তুলনামূলক স্বচ্ছ ও কম খরচের ঋণের পরিবর্তে যদি বাংলাদেশকে বেশি ব্যয়বহুল বা কম স্বচ্ছ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়, তাহলে সেটিকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলা যাবে না।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তা গ্রহণ করবে, আবার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো শর্ত গ্রহণ না করার মতো আর্থিক সক্ষমতাও তার থাকবে। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো পছন্দের ক্ষমতা; নির্ভরশীলতা নয়।
বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা অর্জনের পথও মোটামুটি স্পষ্ট। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে, কিন্তু তার বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি টাকা কতটা জনকল্যাণ ও উৎপাদন বাড়াচ্ছে, তার হিসাব দিতে হবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে সম্পদ বণ্টনের প্রবণতা কমাতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি কঠিন প্রশ্নও রয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কারের বোঝা যদি শুধু সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়, তাহলে সেই সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থন পাবে না। কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, বড় ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী এবং অপচয়কারী সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের ব্যয়ের অংশীদার না করে শুধু ভর্তুকি কমানো, কর বাড়ানো কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ানোর পথে হাঁটা ন্যায়সংগত হবে না। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংস্কারকে তাই শুধু হিসাবের ভারসাম্য নয়, ন্যায়বিচারের ভারসাম্যও নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে সামাজিক ব্যয় এবং সংস্কারের বণ্টনগত প্রভাবের ওপর আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কর্মসূচি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সামাজিক ব্যয় রক্ষা করে, সেগুলোর বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অতএব বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে চুক্তি হবে কি হবে না—শুধু তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে বৈদেশিক ঋণ হবে উন্নয়নের একটি উপকরণ, টিকে থাকার অবলম্বন নয়? যদি রাজস্বব্যবস্থা শক্তিশালী হয়, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি আসে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য নির্ভরশীলতার প্রতীক হবে না; বরং প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতার একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন না আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলবিরোধী আবেগ, না অন্ধ ঋণনির্ভরতা। প্রয়োজন বাস্তববাদী ও আত্মমর্যাদাশীল অর্থনৈতিক কূটনীতি। যেসব সংস্কার দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজন, সেগুলো নিজেদের উদ্যোগেই করতে হবে; যেসব শর্ত সামাজিকভাবে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল, সেগুলোর সময়, গতি ও পদ্ধতি নিয়ে দৃঢ়ভাবে আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোকে আড়াল না করে সেগুলোর সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসলে বৈদেশিক ঋণ না নেওয়ার নাম নয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হলো এমন সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে একটি দেশ নিজের প্রয়োজন, সামর্থ্য ও জনগণের কল্যাণ বিবেচনা করে কখন ঋণ নেবে, কতটা নেবে এবং কোন শর্তে নেবে—সেই সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। বাংলাদেশের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও এখানেই। বৈদেশিক ঋণ কমানো নয়, ঋণের প্রয়োজন কমিয়ে আনার মতো একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য।
লেখকঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]
আইএমএফ ও বাংলাদেশ: ঋণ, সংস্কার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সন্ধিক্ষণ
ড. মোঃ মিজানুর রহমান
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
১৮ অক্টোবর (রবিবার), ২০২৬, ৫ঃ০১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
