সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় দখলদার। বাড়ে দখলের পরিধি। দখলদারের সংখ্যা। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান হলেও কোনোদিন দখলদারদের সাজা হয় না। ফলে জায়গা উদ্ধারের কিছুদিনের মধ্যে নতুন কেউ অথবা পূর্বের দখলদাররাই অসাধু কর্মকর্তাদের বাগে এনে আবার স্থাপনা গড়ে তোলে। এভাবেই যুগের পর যুগ চলে যাচ্ছে। রেলের জায়গা যেন যুদ্ধে পাওয়া গনিমতের মাল। আগে একদল এসব দখল করলেও এখন দুই দলের কিছু চেনামুখ মিলেমিশে দখলে নেমেছে।
সেই ধারাবাহিকতায় ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের গেট সংলগ্ন রেলওয়ের জমি দখল করেছে প্রভাবশালী একটি চক্র। তারা জায়গাটিকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে দোকানঘর তৈরি করেছে। পরে ফাস্টফুড, চা ও ভাজাপোড়ার দোকানিদের কাছে এসব ঘর চুক্তিভিত্তিক ভাড়া দেয়া হয়েছে। আবার একটা গ্রুপ রাস্তার উপর ইট বালি খোয়ার পসরা সাজিয়ে বসেছে। এতে মূল কলেজ একেবারেই ঢাকা পড়েছে। পড়াশোনার পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্ন হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে এই অবৈধ দখল প্রক্রিয়া এখনো থামেনি। সরজমিন দেখা যায়, স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি সেখানে এখন ভ্রাম্যমাণ ফাস্টফুড দোকানিরাও ভিড় জমাচ্ছে। ফলে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের মূল ভবন আড়ালে পড়ে গেছে। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। ওই সময়ে একাধিক মেইল ও লোকাল ট্রেন যাতায়াত করে। ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে রেলওয়ে জানিয়েছে, দোকানগুলোর কোনো বৈধতা নেই। খুব দ্রুতই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।
কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা জানান, দখলদাররা জায়গাটি দখল করে সৌন্দর্য নষ্ট করছে। তারা অনতিবিলম্বে এলাকাটি মুক্ত করার দাবি জানান। একইসঙ্গে জড়িদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলে ধরেন। বগুড়া জজ কোর্টের আইনজীবী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এডভোকেট দিলরুবা নুরী বলেন, কলেজের নতুন গেটে যেতে হলে রেললাইন পার হতে হয়। অবৈধ স্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এখানে কোনো প্রাণহানি ঘটলে তার দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, দোকানপাটের কারণে যাতায়াতের রাস্তা সরু হয়ে গেছে। এতে বাস ঘোরানো কঠিন হয়। এমনকি সিগন্যালকর্মীরাও ঠিকমতো দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারেন না। কলেজে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। দখলদারদের গড়ে তোলা দোকানের কারণে কলেজ গেট সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে আমাদের শিক্ষার্থী বহন করা বাসগুলো কলেজ থেকে বের হতে এবং প্রবেশ করতে খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা রেলওয়ের কাছ থেকে রেললাইনের পাশ থেকে কলেজ পর্যন্ত জায়গাটুকু বাগান করার জন্য লিজ নেয়ার চেষ্টা করছি। জায়গাটি পাওয়া গেলে সেখানে বাগান করে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি পরিবেশও সুন্দর করা সম্ভব হবে। কিন্তু যারা সেখানে দোকানপাট বসিয়েছেন, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে বিষয়টি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। বগুড়া স্টেশন মাস্টার সাজেদুর রহমান সাজু বলেন, রেললাইনের পাশে এসব দোকান থাকা পুরোপুরি অবৈধ। নিরাপদ ট্রেন চলাচলে এটি চরম বাধা তৈরি করছে। উচ্ছেদের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর আগেও একবার আংশিক উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে আবার নতুন দোকান উঠেছে।
স্টেশন মাস্টার আরও বলেন, বিশেষ করে বিকাল ও সন্ধ্যায় সরকারি আজিজুল হক কলেজের ফটকের সামনে শত শত মানুষের চলাচল থাকে। এ সময় রেলপথে অনেক ট্রেন চলাচল করে। মানুষের এমন আনাগোনার মধ্যে দোকানপাট থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। উপ-সহকারী প্রকৌশলী আসলাম হোসেন বলেন, বাণিজ্যিক লাইসেন্স ছাড়া জোরপূর্বক জমি দখল করে এই বাণিজ্য চলছে। এতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এর আগে বেশ কয়েকবার উচ্ছেদের চেষ্টা চালানো হলেও রাজনৈতিক বা সামাজিক ছত্রছায়ায় আবার দখল হয়ে যায়।
রেলওয়ের ফিল্ড কানুনগো মো. রাজীবুজ্জামান জানান, সাইফুল ইসলাম নামের একজন হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ দেখিয়ে দুটি দোকান টিকিয়ে রেখেছেন। তবে ওই স্থগিতাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাদের থেকে রাজস্ব নেয়া বন্ধ রয়েছে। বাকি সব দোকান পুরোপুরি অবৈধ। ইতিমধ্যেই জমি দখলের অভিযোগে মাহমুদুল ও জহুরুল নামের দু’জনের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দেয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই শহর জুড়ে সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। ওদিকে দলীয় প্রভাবের কারণে রেলওয়ের কর্মকর্তারা জোরালোভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারছেন না। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, বিগত সময়ে দায়িত্ব পালনকারী কিছু অসাধু রেল কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অবৈধ উপায়ে এসব জমি দখলদারদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল।
