ক্রিকেট কূটনীতিতে বুলবুলের জয় নাকি হার!

ক্রিকেট কূটনীতিতে বুলবুলের জয় নাকি হার!

ফন্ট সাইজ:

ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার নাটকীয় অবসান ঘটেছে লাহারের বৈঠকে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সম্মতিতে পাকিস্তান তাদের ভারত ম্যাচের বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে এতে বাংলাদেশের কি লাভ হয়েছে? বিশ্বকাপ বয়কট করলেও আইসিসি’র কোনো শাস্তির মুখে পড়ছে না বাংলাদেশ, অন্যদিকে পাকিস্তানের মতো বন্ধুপ্রতীম দেশকেও ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামাতে সক্ষম হয়েছে বিসিবি। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অনুরোধে পাকিস্তান তাদের ‘ইউ-টার্ন’ নিয়েছে, যা আইসিসিকে বিশাল আর্থিক লোকসান থেকে রক্ষা করেছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের শর্তগুলো। আইসিসি জানিয়েছে, ২০২৮-৩১ মেয়াদে বাংলাদেশকে একটি বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হবে। নিজেরা বিশ্বকাপে না খেলে অন্যকে খেলার অনুরোধ জানানো এবং এর বিনিময়ে ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্ট নিশ্চিত করা বুলবুলের এই কৌঁশলি অবস্থানকে কেউ বলছেন কূটনৈতিক বিজয়, আবার কেউ দেখছেন স্রেফ আপস হিসেবে। শুধু তাই নয় পাকিস্তানের খেলাতে বাংলাদেশ পা দিয়েছে কিনা তাও প্রশ্ন আছে! এ নিয়ে বিসিবি’র অভ্যন্তরেও রয়েছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। যদিও এখনই কেউ মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না এ বিষয়ে। তবে ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর বুলবুলকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এমনটাই ধারণা করছেন দেশের অনেক ক্রিকেট বোদ্ধা! বিশ্বকাপ বর্জন করার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে আইসিসি’র নিষেধাজ্ঞার খড়গ ঝোলার ব্যাপক আশঙ্কা ছিল। কিন্তু লাহোরে পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি এবং আইসিসি প্রতিনিধির সঙ্গে বুলবুলের রুদ্ধদ্বার বৈঠক পরিস্থিতি বদলে দেয়। আইসিসি তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, বিশ্বকাপে অংশ না নেয়ায় বিসিবি’র ওপর কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করা হবে না। উল্টো ২০৩১ সালের আগে একটি আইসিসি ইভেন্ট বাংলাদেশে আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ভারতের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার সেই ঘটনার সূত্রপাত। ভারতে নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়নি বাংলাদেশ। আইসিসিও টাইগারদের বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে সেখানে স্কটল্যান্ডকে সুযোগ করে দেয়। এরপর বাংলাদেশের সঙ্গে এই অচরণের কারণে পাকিস্তান প্রথমে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেয়। পরে অবশ্য তারা বিশ্বকাপ খেলতে গেলেও ১৫ই ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার ঘোষণা দেয়। তাতেব নড়েচড়ে বসে আইসিসি। পাকিস্তান যেভাবে বাংলাদেশের ওপর ‘দ্বৈত নীতি’র অভিযোগ তুলে আইসিসিকে চাপে ফেলেছিল, তার সুফল ভোগ করলো বাংলাদেশ। আইসিসি সম্ভবত বড় কোনো বিবাদ এড়াতে বাংলাদেশকে এই ‘পুরস্কার’ দিয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে বিসিবি’র জন্য বড় স্বস্তি। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। বাংলাদেশ যখন নিজে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিশ্বমঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ালো, তখন পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলার অনুরোধ জানানোকে নৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন ক্রিকেট বোদ্ধাদের অনেকেই। প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে, জরিমানা এড়ানো এবং ভবিষ্যৎ ইভেন্ট নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু ক্রিকেটের মূল স্প্রিট বা মাঠের লড়াইয়ের জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ দর্শকসারিতে। নিজেরা খেলতে না পারলেও আইসিসিকে বিশাল আর্থিক লোকসান থেকে বাঁচিয়ে দেয়া এবং ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বুলবুল আইসিসি’র গুডবুকে নাম লিখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে ক্ষোভ রয়েই গেছে। বাংলাদেশ কি তবে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতিতে বেশি সফল হতে চাইছে? ২০৩১ সালের টুর্নামেন্ট আয়োজন পর্যন্ত এই সফলতার গল্প টিকে থাকবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত, বিসিবি’র এই ‘জয়’ কেবল কাগজ-কলমে আর প্রশাসনিক
টেবিলই সীমাবদ্ধ।