হুতিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রে কাঁপবে সৌদি আরব

ইরানের ছক, চীনের যন্ত্রাংশ

হুতিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রে কাঁপবে সৌদি আরব

ফন্ট সাইজ:

ইরানের নকশা অনুসরণ করে চীনা যন্ত্রাংশ দিয়ে উন্নত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারলে সৌদি আরবের গভীরে এবং ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে গোষ্ঠীটি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনটি অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর) অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে বলা হয়েছে, হুতিরা এত দিন ইরান ও আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের ওপর নির্ভর করলেও এখন নিজেরাই উন্নত অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তৈরির চেষ্টা চলা ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের ‘খাইবার শেকান’ নামের নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২২ সালে তেহরানে প্রথম এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে তৈরি করা গেলে এর পাল্লা প্রায় ১২০০ মাইল বা ১৯৩০ কিলোমিটার হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এর আওতায় আসবে।
সিএআরের অনুসন্ধানে গত বছর ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের আটক করা দুটি চালানের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এসব চালানে অন্যান্য পণ্যের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পরিবহন করা হচ্ছিল বলে জানানো হয়েছে।

জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন ও মূল কাঠামো তৈরির জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ধাতব যন্ত্রাংশ, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাখনা এবং কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট মোটরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু উপাদান। খাইবার শেকান সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এসব উপাদানের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পাওয়া গেছে বিভিন্ন সরঞ্জাম, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল। এর মধ্যে এমন তাপসহনশীল উপাদানও ছিল, যা উড্ডয়নের সময় প্রচণ্ড তাপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু অংশকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়।
তদন্তকারীরা চালানের নথিপত্র পরীক্ষা করে চীনের একটি নির্ভুল ধাতব যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি মহাকাশ প্রযুক্তিতে ব্যবহারের উপযোগী বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ তৈরির দক্ষতার কথা প্রচার করে। তবে প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।

সিএআরের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, এসব যন্ত্রাংশ আমদানি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হুতিরা হয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে, নয়তো সেই চেষ্টা করছে।

কেন বিপজ্জনক হতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র?
ইরানের খাইবার শেকানকে দেশটির কিছু অন্য ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় বেশি সক্ষম বলে মনে করা হয়। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।
এর কিছু সংস্করণে উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে ওয়ারহেড বহনকারী অংশটি মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে। এরপর লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ওই অংশ নিজের গতিপথ সমন্বয় করতে পারে।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০০০ মাইল বা ৯৬৫৬ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
প্রায় ১২০০ মাইল পাল্লার একটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুতিদের জন্য সৌদি আরবের গভীরে আঘাত হানার পাশাপাশি ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র কিছু ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তুলনায় বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতেও সক্ষম হতে পারে।

চীনা উপাদানের ওপর বাড়ছে নির্ভরতা
অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ওপর নির্ভর করার পর হুতিরা ধীরে ধীরে নিজেদের অস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে।

জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের কাছে পাঠানোর সময় জব্দ করা পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উঠে এসেছে। এসব উপাদানের কিছু বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে অন্য কিছু উপাদান বিশেষভাবে ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি।

চীন বলেছে, ইয়েমেনের হুতিদের ওপর জাতিসংঘের আরোপ করা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে চলে। তবে চীনা উৎসের যন্ত্রাংশের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এমন প্রশ্ন সামনে এনেছে—দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছানো ঠেকাতে বিদ্যমান নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর।