বগুড়া জেলায় প্রতি বছর প্রায় চারশ’ কোটি টাকার সবজি পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি রোধ এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য নিয়ে আট মাস আগে সরকারি উদ্যোগে জেলায় সৌরবিদ্যুৎচালিত আটটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আট মাস পার হয়ে গেলেও কৃষি খাতের এই সম্ভাবনাময় উদ্যোগটি কার্যত কোনো কাজেই আসছে না। সঠিক তথ্যের অভাব, কৃষক ও অপারেটরদের সচেতনতার ঘাটতি, সরকারি তদারকির শিথিলতা এবং কার্যকর নির্দেশনার অভাবে আটটি কোল্ড স্টোরেজের বেশির ভাগই এখন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আর্থিক সহায়তায় ‘ফারমারস মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ শীর্ষক সরকারি প্রকল্পের আওতায় জেলার শিবগঞ্জ, গাবতলী ও সারিয়াকান্দি উপজেলায় এসব কন্টেইনারভিত্তিক উন্নত প্রযুক্তির মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ভিত্তিক এ প্রকল্পের প্রতিটি ইউনিট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ধরে রাখার সক্ষমতা থাকা এসব কোল্ড স্টোরেজ সরজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র। বেশির ভাগ কোল্ড স্টোরেজে ঝুলছে তালা। যে দুই-একটি সচল রাখা হয়েছে, সেগুলোর ভেতরেও কোনো কৃষিপণ্য বা সবজি সংরক্ষিত নেই। পাশাপাশি এসব কোল্ড স্টোরেজের মূলে থাকা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থারও কোনো ব্যবহার দেখা যায়নি। কোনো কোনো স্থানে নামমাত্র যেটুকু কাজ চলছে, তা পরিচালনা করা হচ্ছে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। মহাস্থান হাটের নিকটবর্তী মনিতলা এলাকায় স্থাপিত একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করছেন কৃষিতে ডিপ্লোমাধারী মো. রোকনুল ইসলাম রোকন। এই অপারেটর জানান, প্রায় আট মাস আগে তিনি কন্টেইনারের বরাদ্দ পান। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া ও অবকাঠামোগত কেনাকাটাসহ অন্যান্য প্রাথমিক কাজে তাকে নিজের পকেট থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোল্ড স্টোরেজটিতে সৌর প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি ও জাতীয় গ্রিডের সংযোগ তিনটি ব্যবস্থাই বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু তিনি সোলার সিস্টেম ব্যবহার করতে না পেরে পুরোপুরি গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছেন। এর ফলে কোল্ড স্টোরেজ সচল রাখতে গিয়ে প্রতি মাসে তাকে ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। রোকন আরও জানান, কন্টেইনার পাওয়ার পর প্রথম দিকে তিনি ১৪ দিন কাঁচামরিচ সংরক্ষণ করেছিলেন। তবে সংরক্ষণ করার পর বাজারে হঠাৎ কাঁচামরিচের দাম কমে যাওয়ায় তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। কেনা দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা লোকসান দিয়ে তাকে মরিচ বিক্রি করতে হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি কিছুদিন বিটরুট ও লেবু সংরক্ষণ করলেও লোকসানের আশঙ্কায় এবং বাজারের সঠিক তথ্য না থাকায় বর্তমানে তার কোল্ড স্টোরেজে কোনো কৃষিপণ্য নেই।
একই হাটের কাছাকাছি অপর একটি কোল্ড স্টোরেজের অপারেটর তাহেরুল ইসলাম জানান, বরাদ্দের পর অল্প কিছুদিনের জন্য সেখানে পটোল ও ঢ্যাঁড়স রাখা হয়েছিল। কিন্তু এই আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে কার্যকর ও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে তার কাছে স্পষ্ট কোনো ধারণা বা প্রশিক্ষণ নেই। কারিগরি জ্ঞান না থাকায় শেষ পর্যন্ত কোল্ড স্টোরেজটি তালাবদ্ধ করে রাখা ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না। সম্প্রতি প্রকল্প পরিচালক এলাকা পরিদর্শনে এলে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন এবং দ্রুত কর্মকর্তা পর্যায়ে প্রশিক্ষণের জোর দাবি জানান। গাবতলীর বাগবাড়ির কোল্ড স্টোরেজ অপারেটর মো. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় কৃষকেরা আগ বাড়িয়ে পণ্য না আনলে কোল্ড স্টোরেজ চালু রেখে কোনো লাভ হয় না। বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে মাঝে মাঝে এটি চালু করা হলেও বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখতে হয়। কৃষকদের অনীহা ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করে তিনি জানান যে কৃষকেরা এসব হিমাগারে সবজি সংরক্ষণ করতে চান না। একইভাবে মোকামতলার অপারেটর মো. সুজাউল ইসলাম জানান, প্রযুক্তির দিক থেকে এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে এটি ব্যবহারে পরিচিতি তৈরি হয়নি। ফলে কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ কাজে আসছে না। বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. মাহফুজ আলম জানান, জেলায় প্রতি বছর ৫ লাখ টনেরও বেশি সবজি উৎপাদিত হয়।
কিন্তু উপযুক্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর উৎপাদিত সবজির একটি বড় অংশ বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ফলে বছরে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৬০০ টনেরও বেশি সবজি পচে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। বাজারে এসব নষ্ট হওয়া সবজির বার্ষিক বাজারমূল্য আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা। কৃষকদের এই বিপুল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে দেশব্যাপী মোট ১০০টি কন্টেইনারভিত্তিক মিনি হিমাগার নির্মাণ করার উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে বগুড়ায় ইতিমধ্যে আটটি মিনি হিমাগার স্থাপন সম্পন্ন করা হয়েছে। সবজি ও আলু উৎপাদন বেশি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে শিবগঞ্জে চারটি, গাবতলীতে তিনটি এবং সারিয়াকান্দিতে একটি হিমাগার স্থাপন করা হয়। প্রতিটি হিমাগার সোলার সিস্টেম এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মাহফুজ আলম স্বীকার করেন যে, সোলার সিস্টেমে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কারিগরি ও ব্যবহারগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে দ্রুতই এসব সমস্যা নিরসন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। উন্নত বিশ্বে কৃষক পর্যায়ে এমন ছোট মিনি হিমাগারের ব্যবহার বহুল প্রচলিত হলেও বাংলাদেশে এই প্রথম এমন উদ্যোগ নেয়া হলো। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রাথমিক বাধা কাটিয়ে উঠলে এটি গ্রামভিত্তিক কৃষিখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ এ প্রসঙ্গে জানান, মাঠ পর্যায়ে যেসব অব্যবস্থাপনা ও সমস্যার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকল্পটির পরিচালক তালহা জুবায়ের মাসরুর বগুড়ায় এসে সরাসরি এসব মিনি হিমাগার পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনে উঠে আসা বিষয়াবলী এবং অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হবে। সরকারি এই টেকসই উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হলে সবজির বিশাল অপচয় রোধ করার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকসমাজ আর্থিকভাবে লাভবান হবে এবং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি আরও বেগবান ও শক্তিশালী হবে।
