উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ২৯

উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ফন্ট সাইজ:

বাঙ্গালার সাধারণ লোক কখনো ঐরূপ ভাষায় কথাবার্তা বলে না। ইহাকে তাহাদের মাতৃভাষা বলা যাইতে পারে না বরং তাহা মাতৃভাষার বিকৃতি মাত্র।”২৫৪
তারপর, খাদেমোল্‌ এসলাম লেখেন, “অন্যরূপ বাঙ্গালা এই দেশে বহুকাল পূর্ব হইতেই প্রচলিত আছে। তাহাতে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়ের ধর্ম ও কারবারের আবশ্যকীয় প্রায় সমস্ত ব্যবহার ও স্থান আছে। এই ভাষাই বাস্তবিক পক্ষে এদেশের লোকের মাতৃভাষা।
“এইরূপ ভাষাকে মুসলমানী বাঙ্গালা বলা ঠিক হয় না, কারণ এই ভাষায় আমরা হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতি পুরুষানুক্রমে কথাবার্তা ও লেখাপড়া করিয়া আসিতেছি। কাগজ, কলম, কেতাব, আদালত, আরজী, ইনসাফ, কুরছি, শেজ, দোয়াত, সির, সির্নী, মগজ, বরতন, পেয়ালা, তস্তুরী, পালং, তোষক,বালিশ, গয়রহ ইত্যাদি শব্দ আমরা উভয় সমাজে সর্ব্বদা ব্যবহার করিয়া আসিয়াছি এবং এখনও করিয়া থাকি।”২৫৫
এবার তিনি দুঃখ করে লেখেন, “কিন্তু আজ ২০/২৫ বৎসর হইতে দেশের দুর্ভাগ্যবশতঃ শিক্ষাদোষে বাঙ্গালী হিন্দু ভ্রাতাদের মনে মুসলমান ভ্রাতাদের প্রতি ভালবাসা কমিয়া যাওয়ায়, তাহারা মুসলমানগণ হইতে পৃথক হওয়ার উদ্দেশ্যেই যেন মাতৃভাষার অন্তরাত্মাস্বরূপ পুরুষানুক্রমে প্রচলিত শব্দসমূহের স্থলে, নূতন শব্দ ব্যবহার করত এবং তাহাকে নানা রকমের বিকৃত আচরণ দ্বারা আবৃত করিয়া তাহারা যেন বৃদ্ধ মায়ের এক যুবতী সতীন গড়িয়াছেন।”২৫৬
কিন্তু বাংলা ভাষার এই সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়াকে কলকাতাভিত্তিক হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায় এমন চরম উদ্দীপনার সঙ্গে সমর্থন করেছিল যে, তারা সাধারণ্যে প্রচলিত কিছু ফারসি শব্দের উপস্থিতির কারণে বাঙালি মুসলমান লেখকদের সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যকে হিন্দু বাঙালির জন্য অপাঠ্য ঘোষণা করে, তা প্রকাশের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।
এই অপপ্রয়াসের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যকার ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) একদা, ১৯৩৭ সালে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়া পড়া নামে একটি গল্পের বই লেখেন, কিন্তু হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘টেক্সট বুক কমিটি অব বেঙ্গল’, গল্পগুলোর ভেতর ‘খোদা’ ও ‘পানি’র মতো বহুল প্রচলিত কয়েকটি ফারসিশব্দের উপস্থিতির কারণে, গল্পের বইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করে।
প্রথমে টেক্সট বুক কমিটি মনসুর আহমদকে পত্রযোগে জানায় যে, তাঁর লিখিত নয়া পড়া ‘পাঠ্য পুস্তক হিসেবে অনুমোদিত হইয়াছে, তবে উহাতে যেসব আরবী-ফারসি শব্দ আছে, সেসব শব্দের জায়গায় বাংলা প্রতিশব্দ বসাইতে হইবে’। কেননা, “‘আল্লা’, ‘খোদা’, ‘পানি’ ইত্যাদি শব্দ প্রাইমারি পাঠ্য পুস্তকে থাকিলে, হিন্দু ছাত্রদের ধর্মভাবে আঘাত লাগিবে।” এই অযৌক্তিক পত্রের উত্তরে মনসুর আহমদ সংশ্লিষ্ট কমিটিকে লেখেন যে, “একশ বছরের বেশী বাংলার মুসলমান ছাত্ররা পাঠ্য-পুস্তকে ‘ঈশ্বর’, ‘ভগবান’, ‘জল’ পড়াতেও যদি তাদের ধর্মভাবে আঘাত লাগিয়া না থকে, তবে এখন হইতে ‘আল্লা’, ‘খোদা’ পড়িয়া হিন্দুদেরও ধর্মভাবে আঘাত লাগা উচিত নয়।” কিন্তু টেক্সট বুক কমিটি এই যুক্তিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, ‘বই বাতিল করিয়া দিতে তাঁরা বাধ্য হইলেন বলিয়া দুঃখিত’ হয়েছিলেন।২৫৭
আবুল মনসুর আহমেদের এই তিক্ত অভিজ্ঞতাটি মোটেই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামক একজন হিন্দু সাহিত্যিক কলকাতাভিত্তিক মাসিক প্রবাসী পত্রিকার ১৩৩৯ বাংলা সালের বৈশাখ সংখ্যায়, অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৩২ সালের এপ্রিলে, মাদ্রাসার ‘প্রথম শ্রেণীর বালকদের পাঠ্য’, মোহাম্মদ মোবারক আলি রচিত, “মক্তব-মাদ্রাসা সাহিত্য-প্রথমভাগ” নামে একটি গল্পগ্রন্থে ‘পবিত্র কোরান’ শব্দবন্ধের বদলে ‘পাক কোরান’, ‘পুণ্য’ শব্দের বদলে ‘সওয়াব’, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’র বদলে ‘পাক সাফ’, ‘পাপী’র পরিবর্তে ‘গোনাহগার’, ইত্যাদি আরবি/ফারসি শব্দ ব্যবহার করার জন্য সমালোচনা করেছেন। এই রমেশচন্দ্রের কাছে ‘সেজদা’ ও ‘সাষ্টাঙ্গ প্রণাম’ সমার্থক শব্দ।
একই সঙ্গে,তিনি আবার বহু ভাষাবিদড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ (১৮৮৫-১৯৬৯) রচিত “মক্তব-মাদ্রাসা সাহিত্য-দ্বিতীয় ভাগের’ একটি গল্পে ‘আকাশ’কে ‘আসমান’, ‘জল’কে ‘পানি’ ও ‘অতিথিসেবা’কে ‘মেহমানদারী’ লেখার জন্যও সমালোচনা করেছেন। রমেশচন্দ্রের মতে, “কষ্ট-প্রয়াস দ্বারা আনীত বিদেশী (আরবী-পার্সি) শব্দগুলি যেন নিমন্ত্রণ সভায় অনাহূতের মতো অশোভন, ভাতের মধ্যে কাকরের মতো পীড়াদায়ক।”২৫৮
সবশেষে, একটি গুরুতর বিপদ থেকে ‘বাঙ্গালী’ সম্প্রদায়কে, অর্থাৎ তার হিন্দু সম্প্রদায়কে, সাবধান থাকার আহ্বান জানিয়ে রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “শুনা যায়, ঢাকার সেকেন্ডারিবোর্ড ‘মুসলমানী বাঙ্গালায়’ লিখিত পুস্তক হিন্দু-মুসলমান সকল ছাত্রের জন্যই অবশ্য পাঠ্য করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। বাঙ্গালী, সাবধান”।২৫৯
রমেশচন্দ্রের এই প্রবন্ধ প্রকাশের চার মাসের মাথায়, প্রবাসী’রই ভাদ্র সংখ্যায়, অর্থাৎ ১৯৩২ সালের আগস্টে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৩১-১৯৪১) একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। বাংলা ভাষায় কিছু আরবি-ফারসির অন্তর্ভুক্তি যে ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিতে সংঘটিত হয়েছে, সে যুক্তি প্রদর্শন করে তিনি অভিন্ন শিরোনামে - মক্তব-মাদ্রাসার বাঙ্গালা ভাষা - লিখিত একটি প্রবন্ধে বলেছেন, “এমন কোনো সভ্য ভাষা নেই, যে নানা জাতির সঙ্গে নানা ব্যবহারের ফলে বিদেশী শব্দ কিছু-না-কিছু আত্মসাৎ করেনি। বহুকাল মুসলমানের সংশ্রবে থাকতে বাংলাভাষাও অনেক পারসী শব্দ এবং কিছু কিছু আরবীও স্বভাবতই গ্রহণ করেছে। বস্তুত বাংলা ভাষা যে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই আপন তার স্বাভাবিক প্রমাণ ভাষার মধ্যে প্রচুর রয়েছে।”২৬০
বাংলা ভাষায় কিছু আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শব্দের অন্তর্ভুক্তি ও তাদের সহজ ও স্বাভাবিক ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “বাজারে এসে সহস্র টাকার নোট ভাঙানোর চেয়ে হাজার টাকার নোট ভাঙানো সহজ। সমনজারি শব্দের অর্ধেক অংশ ইংরেজি, অর্ধেক পারসী, এর জায়গায় ‘আহ্বান প্রচার’ শব্দ সাধু সাহিত্যেও ব্যবহার করার মত সাহস কোনো বিদ্যাভূষণেরও হবে না। [...] নেশাখোরকে যদি মাদকসেবী বলে বসি তাহলে খামাকা তার নেশা ছুটে যেতে পারে। [...] বদমায়েশকে দুর্বৃত্ত বললে তার চোট তেমন বেশি লাগবে না। এই শব্দগুলো যে এত জোর পেয়েছে এর কারণ বাংলাভাষার প্রাণের সঙ্গে এদের সহজ যোগ হয়েছে।”২৬১
ওদিকে, রবীন্দ্রনাথ আবার বাংলার সঙ্গে অসংগতভাবে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারকেও যথার্থ বিরোধিতা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “শিশু পাঠ্য বাংলা কেতাবে গায়ের জোরে আরবীআনা ও পারসীআনা করাটাকেই আচারনিষ্ঠ মুসলমান যদি সাধুতা বলে জ্ঞান করেন, তবে ইংরেজি স্কুলপাঠ্যের ভাষাকেও মাঝে মাঝে পারসী বা আরবী ছিটিয়ে শোধন না করেন কেন?”২৬২
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা-কেন্দ্রিক এই ‘কম্যুনাল বিরোধ’কে ভালো চোখে দেখেননি, বরং এই বিরোধের ফলে বাংলার ‘ন্যাশনাল ভাগ্য’ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাভাষার সংস্কৃতায়নপন্থীও একই সঙ্গে বাংলাভাষা থেকে প্রচলিত আরবি/ফারসি শব্দ উৎখাতপন্থী প্রভাবশালী হিন্দু অভিজাতসম্প্রদায়ের বড় অংশটি, ভাষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির শিকার হয়ে, খোদ বাংলাভাষাকেই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত করে মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত বাঙালি লেখকদের ‘মুসলমানি বাংলা’ চর্চায় উস্‌কানি দিয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক কুফল হলো, আবুল মনসুর আহমদের মতো হারে-মজ্জায় অসাম্প্রদায়িক অনেক পুরনো কংগ্রেসি রাজনৈতিক কর্মীর ‘জাতীয় কংগ্রেস’ ত্যাগ, ও কৃষক-প্রজা পার্টি হয়ে, মুসলিম লীগে যোগদান এবং পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন প্রদান।
হিন্দুস্তানি ভাষার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকীকরণ শুরু হয়েছিল একজন উপনিবেশবাদী স্কটিশ ভাষাবিদ জন বোর্থউইক গিলক্রিস্টের (১৭৫৯-১৮৪১) হাত ধরে। গিলক্রিস্ট, যিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হিন্দুস্তানি ভাষা বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন, খোদ হিন্দুস্তানি ভাষাটিকেই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত করে ভারতীয় রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বিকাশে অবদান রাখেন। এই প্রপঞ্চটি ব্যাখ্যার জন্য তার রাজনৈতিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপটটি,সংক্ষেপে হলেও, আলোচনা প্রয়োজন।
ষোড়শ শতাব্দীর সপ্তম দশক থেকে শুরু করে সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যে গোটা বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সময়কালে ‘বহির্ভারত ও উত্তর ভারত থেকে ভাগ্যান্বেষী অনেক শাসক, সৈনিক, ধর্ম প্রচারক, আলেম, কবি, শিল্পী, চিকিৎসক বাংলায় আগমন করেন। [...] রাজধানী ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, হুগলি শহর ও বন্দর এলাকায় তাঁরা ভিড় জমান। এর ফলে ধীরে ধীরে তাদের মুখের ভাষা দ্বারা স্থানীয় জনগণও প্রভাবিত হতে থাকেন।’২৬৩
ইতিমধ্যে, ষোড়শ শতাব্দীর অষ্টম দশকের শুরুতে, দিল্লি-কেন্দ্রিক মুঘল সম্রাট আকবরের (১৫৪২-১৬০৫) অর্থমন্ত্রী, রাজা টডরমল (১৫০৩-১৫৮৯),ফারসিকে সরকারি যোগাযোগ ও আদালতের ভাষা হিসেবে ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠা করেন। স্বভাবতই, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের মধ্যে বাংলার নাগরিক জীবনে বাংলা কথ্য ভাষার সঙ্গে প্রচুর আরবি, ফারসি, উর্দু-হিন্দি বা হিন্দুস্তানি প্রভৃতি শব্দের মিশ্রণ ঘটে। বাংলা লেখ্য ভাষার ওপরও তার কিছুটা প্রভাব পড়ে, যে ভাষা পরবর্তীকালে ‘যাবনী মিশাল’ বাংলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

তথ্যসূত্র:
২৫৪. খাদেমোল্‌ এসলাম, “বাঙ্গালীর মাতৃভাষা”, আল্‌ এসলাম, কার্তিক, ১৩২২। বর্তমান এই প্রবন্ধটির জন্য দেখুন, অপূর্ব সাহা, (সম্পাদক ও সংকলক), সেকালের শিক্ষা: উজ্জ্বল উদ্ধার, আলাপ প্রকাশন, কলকাতা, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ১১৮-১২২
২৫৫. প্রাগুক্ত
২৫৬. প্রাগুক্ত
২৫৭. আবুল মনসুর আহমদ, আত্মকথা, পৃষ্ঠা: ২০৭-২০৮
২৫৮. রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, “মক্তব-মাদ্রাসার বাঙ্গালা ভাষা”, অপূর্ব সাহা(সংকলন ও সম্পাদনা) সেকালের শিক্ষা: উজ্জ্বল উদ্ধার,পৃষ্ঠা: ২০১-২০৫
২৫৯. প্রাগুক্ত
২৬০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “মক্তব-মাদ্রাসার বাঙ্গালা ভাষা”, অপূর্ব সাহা (সংকলন ও সম্পাদনা), সেকালের শিক্ষা : উজ্জ্বল উদ্ধার, পৃষ্ঠা: ২০৬-২০৮
২৬১. প্রাগুক্ত
২৬২. প্রাগুক্ত
২৬৩. মুহম্মদ আবদুল জলিল, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাংলা ও বাঙালী সমাজ, পৃষ্ঠা: ৫