ভুল হিসাব-নিকাশে ইয়েমেনে ফের সর্বাত্মক যুদ্ধে সৌদি আরব

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ভুল হিসাব-নিকাশে ইয়েমেনে ফের সর্বাত্মক যুদ্ধে সৌদি আরব

ফন্ট সাইজ:

তেল নির্ভরতা থেকে বের হতে চেয়েছিলো সৌদি আরব। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার জন্য নিয়েছেন বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, পর্যটন বিকাশ এবং বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর আয়োজন সহ নানাবিধ পদক্ষেপ। কিন্তু একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে আবারও ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়েছে রিয়াদ। সম্প্রতি সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় প্রিন্স সালমানের স্বপ্নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

আমিরাতের হঠাৎ প্রস্থান
গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মদদপুষ্ট বাহিনীর গাড়িবহরে সৌদি বিমান হামলার পর দীর্ঘ এক দশকের যৌথ জোটে ভাঙন ধরে। এর জেরে আবুধাবি ইয়েমেন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে সৌদি আরবকে একাই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আমিরাতের এই প্রস্থান পুরো অঞ্চলকে হতবাক করে দেয়। ইউএই-সমর্থিত যোদ্ধারা জানান, তাদের চলে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্রে এক মারাত্মক শূন্যতা তৈরি করেছে। আমিরাতের সুশৃঙ্খল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার যে দক্ষতা ছিল, সৌদি আরব তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে হঠাৎ বদলানো রণকৌশলে মাঠে থাকা হাজার হাজার যোদ্ধা দিশেহারা হয়ে পড়ে।

প্রস্তুতির ঘাটতি
আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের মাত্র আট সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যৌথ হামলা চালায় এবং তাতে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটির সময়কাল সৌদি আরবের জন্য ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। জুলাই মাসে খামেনির জানাজায় অংশ নিতে যাওয়া হুতি প্রতিনিধিদের বহনকারী একটি যাত্রীবাহী বিমানের অবতরণ ঠেকাতে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। এর জবাবে হুতিরা যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত অঞ্চল দখল করে নেয় এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, সৌদি আরব হুতিদের এমন সর্বাত্মক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং মাঠের মিত্রদের সঙ্গেও তাদের সমন্বয়ের বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

‘অনিশ্চিত’ ট্রাম্প
সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল হিসাব ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাদের অন্ধ নির্ভরতা। রিয়াদকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালয়’ মর্যাদা দেয়া এবং নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিতে ভাটা পড়েছে। গত মাসে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দুবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে হুতিদের ওপর হামলার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প তা সরাসরি নাকচ করে দেন। উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠক করে লোহিত সাগরে নিজেদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিয়েছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি সামরিক বাহিনী কখনোই একা বড় যুদ্ধ লড়ার মতো করে গড়ে ওঠেনি। আগে এমন সংকটে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মার্কিন সহায়তা পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সব কিছুই নির্ভর করে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ওপর— যা সৌদি আরবকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।’

ইয়েমেনের চোরাবালি থেকে সমাধান কি?
এমন পরিস্থিতিতে মিসর ও আমিরাতের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। বৃটেন সৌদি যুদ্ধবিমানকে মাঝআকাশে জ্বালানি সহায়তা দিচ্ছে এবং শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছেন। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বাইরের সাহায্য বা প্রাথমিক কিছু অগ্রগতি এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থামাতে পারবে না। মাঠের দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি ও ঐক্যবদ্ধ কমান্ড প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমাধান না এলে ইয়েমেনের এই চোরাবালি থেকে সৌদি আরবের সহজে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় নেই।