গর্ভে থাকা অবস্থাতেই কোনো ধরনের বড় অস্ত্রোপচার ছাড়া একটি শিশুর বুকের মারাত্মক টিউমার ধ্বংস করেছে চীনা চিকিৎসকরা। তাদের চিকিৎসায় বিশেষ পদ্ধতিতে মাইক্রোওয়েভ রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে পানির অণুগুলোকে স্পন্দিত করে তীব্র তাপ সৃষ্টি করা হয় এবং ভেতর থেকেই টিউমারটি ধ্বংস করে ফেলা হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগের ফলে বেঁচে গেছে শিশুটির জীবন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘আল্ট্রাসাউন্ড ইন অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি’তে সম্প্রতি এই গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ খবর জানিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
গর্ভস্থ শিশুটি জন্মগতভাবে ‘কনজেনিটাল পালমোনারি এয়ারওয়ে ম্যালফরমেশন’ (সিপিএএম) নামের একটি বিরল ফুসফুসের ত্রুটিতে ভুগছিল।
চিকিৎসকদের মতে, প্রতি ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার গর্ভধারণের মধ্যে এমন একটি কেস দেখা যায়। সাধারণত এই সমস্যা খুব বেশি প্রাণঘাতী না হলেও ক্ষেত্রবিশেষে টিউমারটি দ্রুত বড় হয়ে ওঠে এবং গর্ভস্থ শিশুর হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে গর্ভেই শিশুর মৃত্যুর চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে স্টেরয়েড ওষুধ প্রয়োগ কিংবা জরায়ু কেটে জটিল অস্ত্রোপচারের (ফিটাল লোবেকটমি) মাধ্যমে টিউমার অপসারণের ঝুঁকি নেয়া হলেও এতে বেঁচে থাকার হার থাকে মাত্র ৫০ শতাংশের কাছাকাছি।
চীনা চিকিৎসকরা ৪০ বছর বয়সী এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভে থাকা ২২ সপ্তাহের শিশুর ক্ষেত্রে এই নতুন ও নিরাপদ পদ্ধতি বেছে নেন। ওই সময় টিউমারটির আকার বেড়ে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার হয়ে গিয়েছিল, যা শিশুর ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ডকে মারাত্মকভাবে চেপে ধরেছিল এবং শিশুটির পেটে বিপজ্জনকভাবে তরল জমছিল। চিকিৎসকরা একটি সূক্ষ্ম সুচ মায়ের পেট ও জরায়ুর ভেতর দিয়ে সরাসরি শিশুর ফুসফুসের টিউমারে প্রবেশ করান। এরপর সেই সুচের মাধ্যমে মাইক্রোওয়েভ শক্তি পাঠিয়ে অস্বাভাবিক কোষগুলোকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই টিউমারটি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে যায় এবং শিশুর পেটে জমে থাকা তরল সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। পরবর্তীতে ৩৭ সপ্তাহে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখে। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯ কেজি। চিকিৎসকরা এই মিনিম্যালি ইনভেসিভ পদ্ধতিটিকে একটি ‘নতুন মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, একক একটি কেসের ওপর ভিত্তি করে এর সামগ্রিক নিরাপত্তা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা যাবে না। ভবিষ্যতে আরও পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হলে গর্ভস্থ শিশুদের প্রাণঘাতী টিউমার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি একটি স্থায়ী যুগান্তকারী বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নেবে।
