সকাল হতেই কুতুপালং বাজারে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। ক্যাম্প থেকে আসা রোহিঙ্গা ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় জমজমাট হয়ে ওঠে পুরো বাজার। কেউ মোবাইলের দোকানে, কেউ কাপড়ের দোকানে, আবার কেউ কম্পিউটার কিংবা মুদি দোকানে ব্যস্ত। সন্ধ্যা নামলে বাজারের চিত্র আরও বদলে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈধ ব্যবসার আড়ালে কিছু দোকানকে ঘিরে চলে মাদক ও অবৈধ অর্থ লেনদেনসহ নানা কর্মকাণ্ড। এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজারের উখিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বাজার কুতুপালং। রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এ বাজারটি একসময় ছিল ছোট পরিসরের। রোহিঙ্গা ঢলের পর বদলে যায় এর চেহারা। ক্যাম্পের লাগোয়া অবস্থানের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে এটি বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। স্থানীয়দের কাছে বাজারটি ‘রোহিঙ্গা বাজার’ নামেও পরিচিত।
বাজারের বড় একটি অংশ সরকারি খাস জমি ও সরকারি জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে বাজারের পুরো জমির মালিকানা, দাগ-খতিয়ান, ইজারা ও দোকান বরাদ্দের বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্পের বাইরে এসে রোহিঙ্গাদের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও কুতুপালং বাজারে তার বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বাজারে আসছেন। দিনের শেষে কেউ ক্যাম্পে ফিরছেন, আবার কেউ বাজার ও আশপাশে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের একাধিক দোকান পরিচালনার সুযোগ থাকায় স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। এর সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। কুতুপালং বাজারে রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীদের কয়েকজনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ইমাম হোসেন, সাদেক, ইদ্রিস, ইলিয়াস ছাড়াও আনোয়ার ও জামালসহ আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা বাজারে ব্যবসার আড়ালে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকজন রোহিঙ্গা প্রথমে ছোট দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে একাধিক দোকানের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হয়েছেন। মোবাইল, কম্পিউটার ও কাপড়ের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি এড়াতেই একাধিক দোকান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে শুধু রোহিঙ্গারাই নেই। তাদের স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু রোহিঙ্গাকে স্থানীয়ভাবে পরিচয়পত্র করে দেয়ার আশ্বাস দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকত্বের কাগজপত্র তৈরিতে সহযোগিতার জন্য স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যোগাযোগ রাখছেন। তবে এ অভিযোগেরও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। কুতুপালং বাজারকে ঘিরে মাদক কারবারের অভিযোগও নতুন নয়। ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবার দমনে এপিবিএন নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা জানিয়ে আসছে।
তারপরও বাজারের মতো জনবহুল এলাকায় কীভাবে মাদকের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু মাদক নয়, হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গেও কুতুপালং বাজারের নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। রোহিঙ্গাদের বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো অর্থের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক পথে দেশে আসে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এই অর্থের প্রবাহের সঙ্গে কারা জড়িত, বাজারের কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মাধ্যমে লেনদেন হয়, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়রা বলছেন, কুতুপালং বাজারে রোহিঙ্গাদের বৈধ-অবৈধ ব্যবসা আলাদা করে চিহ্নিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে দোকানগুলোর মালিকানা, ভাড়াটিয়ার পরিচয়, জমির মালিকানা এবং ব্যবসার অনুমোদন যাচাই করা দরকার। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের উখিয়া শাখার সভাপতি সাংবাদিক নুর মুহাম্মদ সিকদার বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে অবাধ বিচরণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের নিরাপত্তার বিষয়টি এপিবিএন পুলিশ দেখে। তবে জেলা পুলিশও বিভিন্নভাবে কাজ করছে। এপিবিএন’র সঙ্গে সমন্বয় করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক বিষয় সমাধান হবে বলে আশা করেন তিনি।
