প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নিরাপত্তাসহ একগুচ্ছ বার্তা নিয়ে দিল্লিতে ত্রিবেদী

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নিরাপত্তাসহ একগুচ্ছ বার্তা নিয়ে দিল্লিতে ত্রিবেদী

ফন্ট সাইজ:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরকে সামনে রেখেই নয়াদিল্লি গেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। দিল্লির একটি সূত্র মানবজমিনকে এই তথ্য জানিয়েছে। এ বছরের নভেম্বরের শেষ অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে দ্বিপক্ষীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত যেতে পারেন এমনটি ধারণা করছে ওই সূত্র। সফরটি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই হতে পারে। সূত্রের তথ্যমতে, সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে ঢাকার বার্তা পৌঁছে দেয়াই ত্রিবেদীর হঠাৎ দিল্লি গমনের উদ্দেশ্য।

সোমবার রাতে একটি কমার্শিয়াল ফ্লাইটে নয়াদিল্লি যান ত্রিবেদী। পরের দিন মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সূত্রের দাবি, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সফর ও ভারত-বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গেও ত্রিবেদীর বৈঠক হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সেনাপ্রধানের সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিবেদী ভারতীয় বিভিন্ন পর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। উদ্দেশ্য তারেক রহমানের সফরে তার নিরাপত্তা জোরদারের বার্তা দেয়া।

ঢাকায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে তার নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। যা নিয়ে ঢাকা আপত্তি জানিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সফরে নিরাপত্তার বিষয়ে দিল্লির সঙ্গে আগাম আলোচনা চায় বাংলাদেশ।
সূত্রের দাবি, শুধু নিরাপত্তা নয়, তারেক রহমানের সফরটি যেন আগেকার মতো কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত না থাকে, সে লক্ষ্যে দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষি করছে ঢাকা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, তারেক রহমানের সফরটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তাই এই সফর নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো হয়নি। কেননা, সফর থেকে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি অর্জন করতে চায় সরকার। ঢাকার এই প্রত্যাশার কথাই মোদির কানে পৌঁছে দিয়েছেন ত্রিবেদী।

প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে বিশেষ গুরুত্ব পাবে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ১২ই ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। এক্ষেত্রে গঙ্গার পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে নতুন চুক্তি চায় সরকার। নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে গ্যারান্টি ক্লজ থাকা এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি প্রবাহে বাংলাদেশে বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকে গঙ্গা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাবের বিষয়ে কথা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

অবশ্য গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো পার্থক্য রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং পার্লামেন্টে জানায়, চুক্তিটির নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তখনো আলোচনা শুরু হয়নি। পরে ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামো, বিশেষ করে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে দেখা হবে।

গঙ্গা ইস্যুটির রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের চুক্তির সময় বিএনপি এর বিরোধিতা করে। তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চুক্তিটিকে বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি বলে সমালোচনা করেন। এবার বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে নতুন চুক্তির দাবি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো এবং ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বাংলাদেশে ফেরত দেয়ার বিষয়টিও দিল্লির কাছে তুলে ধরেছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এসব বিষয়ে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্টতা চায় বাংলাদেশ।

তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ চলছে। গত আগস্টে ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিনই দিল্লি গিয়ে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ত্রিবেদী। এবারো ঢাকায় একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর আকস্মিকভাবে দিল্লি গিয়ে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনার বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ঢাকার বার্তা পৌঁছে দিতেই ত্রিবেদীর দিল্লি যাত্রা।

ভারতের সেনাপ্রধানের সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকও এই সফরকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

এর আগে ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভারত সফরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও প্রেসিডেন্ট নীলম সঞ্জীব রেড্ডি বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। ওই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। এবার তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে ঘিরেও ঢাকার প্রত্যাশা- সফরটি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গেও দেখা করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনদিনের দিল্লিযাত্রা শেষে আজ দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।