চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মৌসুমী বোরো ধান সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা খাদ্য অফিসের বিরুদ্ধে। সরকার কর্তৃক ধানের নির্ধারিত মূল্যের অন্তত ৫০ লাখ টাকা কৃষকের পকেটে না গিয়ে চলে গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন খোদ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, খাদ্য পরিদর্শক, খাদ্য গুদামের কতিপয় কর্মচারী ও স্থানীয় কিছু মিল মালিক। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অ: দা:) মো. সেলিম হেলালী বলেন, আমাদের অফিস কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নয়। কেউ যদি কৃষকের মাধ্যমে সুযোগ নেয় সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা কৃষকের ব্যাংক হিসাবে টাকা দিয়েছি এবং ধান ক্রয়ের সময় কৃষককে উপস্থিত করেছি।
একই সুরে কথা বলেছেন খাদ্য পরিদর্শক কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা কৃষকের কৃষি কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে ধান নিয়েছি। এ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কৃষকের অ্যাকাউন্টের নামে চেক ইস্যু করেছি। আমাদের অফিস কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নয়। তবে অনুসন্ধানে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০২৬ সালে সরকারিভাবে সাতকানিয়ায় বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৭৫ টন, যার মূল্য নির্ধারণ করা ছিল প্রতি কেজি ৩৬ টাকা। যেটি বর্তমান বাজারমূল্য থেকে অন্তত ১১ টাকা বেশি। নিয়ম অনুসারে একজন কৃষক ধান বিক্রি করতে পারে ৩ টন বা ৩ হাজার কেজি। সেই হিসাবে একজন কৃষক বাজারমূল্য থেকে অতিরিক্ত পায় ৩৩ হাজার টাকা। তবে এই টাকা কৃষকের পকেটে যায়নি। বেশির ভাগ কৃষক ৩৩ হাজার টাকার বদলে পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার টাকা।
আর বাকি ৩২ হাজার টাকা চলে গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে। অনুসন্ধানে খাদ্য অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসরণ করে অন্তত ২০ জনের অধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। যার মধ্যে ১৫ জনের অধিক কৃষক অ্যাকাউন্ট ও কার্ড ব্যবহার করতে দেয়ার বিনিময়ে পেয়েছেন ১ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ৭০ শতাংশ কৃষক পায়নি তাদের ন্যায্য টাকা। অর্থাৎ প্রতি টনে ১১ হাজার হিসাবে ৭৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার অন্তত ৫০ লাখ টাকা চলে গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে। তবে কেন তারা নিজেরা ধান বিক্রি করেননি? এমন প্রশ্নে একাধিক কৃষক বলেন, আমরা যখন ধান নিয়ে যাই তখন খাদ্য গুদামের কর্মচারীরা বিভিন্ন অজুহাতে ধান নেয় না। তখন মোটা অঙ্কের টাকা গাড়ি ভাড়াসহ আমাদের যথেষ্ট লোকসান হয়। আমাদের পক্ষে এ ধরনের লোকসান গোনা সম্ভব না। তাই আমরা মিল মালিকদেরকে বিক্রি করে দিই। তারা আমাদের কার্ড ব্যবহার করে খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে পারলে ১ হাজার করে টাকা দেয়। এদিকে কৃষকের সূত্র ধরে কথা হয় কয়েকজন মিল মালিকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, আমাদেরকে সুযোগ দেয় বিধায় আমরা বিক্রি করতে পারি। আমরা কৃষকের কার্ড দিয়ে ধান বিক্রি করে থাকি।
তবে গাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে আমাদের বেশি লাভ থাকে না। কারণ প্রতি টনে ৫ হাজার টাকা করে খাদ্য গুদামে দিয়ে ফেলতে হয়। এদিকে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা বলেন, আমাদের কষ্টার্জিত ফসলের প্রাপ্য টাকা আমরা না পেয়ে চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে। কারণ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের কাছ থেকে ধান না নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে ধান নিচ্ছেন। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ রিয়াদ কামাল রনি বলেন, ধান সংগ্রহে অনিয়মের বিষয়টি একটি কমন অভিযোগ। আমরা কৃষকের অ্যাকাউন্টে টাকা দিয়ে থাকি। এখন কৃষক যদি এই টাকাটা উঠিয়ে কাউকে দিয়ে দেয় আমাদের তো করণীয় নেই। কী ধরনের ধান নেয়া হবে তার একটি নির্দিষ্ট শর্ত আছে। এখন কৃষক যদি সেই শর্ত পালন না করতে পারে তাহলে তাদের ধান নেয়ার তো সুযোগ নেই। ধান ক্রয়ের বিষয়টা আরও কতোটা স্বচ্ছ করা যায় এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে। আমরা চাই কৃষক তার ন্যায্য পাওনা পাক।
