‘এই গানই শেষ গান’

‘এই গানই শেষ গান’

ফন্ট সাইজ:

‘হতেও পারে এই দেখা শেষ দেখা। হতেও পারে, এই গানই শেষ গান।’ জেমসের গলার জনপ্রিয় গানটি লেখার সময় গীতিকার প্রিন্স মাহমুদ তবুও সম্ভাবনার কথা বলছিলেন। হতে পারে শেষ দেখা, পুনরায় দেখাও হতে পারে! তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসিকে দেখা না দেখা নিয়ে আর কোনো যদি-কিন্তু নেই। এই শেষ। ৩৯ বছর বয়সে এসে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো আজ মাঠে নামছেন ফুটবল জাদুকর। ভেন্যু আলবিসেলেস্তেদের ঐতিহাসিক মাঠ মনুমেন্তাল, প্রতিপক্ষ বেনিন। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৫টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচ দিয়েই চিরচেনা আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় বলে দিচ্ছেন আর্জেন্টিনার বরপুত্র।
বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগের রাতটা তো আমাদেরও চেনা। রান্নাঘরে বাড়তি আয়োজন চলে, কেউ একজন গোপনে চোখ মোছে, আর সবাই এমন ভান করে, যেন আজ আর দশটা সাধারণ রাত। আসলে তো তা নয়। বিদায়ের বিষণ্নতা মিশে থাকে সেই রাতে। বুয়েনস আয়ার্সে এখন সেই রাতের আয়োজন চলছে।

গত রোববার বুরকিনা ফাসোকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেয়ার পর আরেক প্রস্তুতি। সতীর্থদের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে মেসির সঙ্গে স্মৃতি, ভালোবাসা আর তাকে বিদায় জানানোর বিষাদ। মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে বারবিকিউ খাবো, এই দিনগুলো ওর সঙ্গে উপভোগ করবো। এটা ওর প্রাপ্য। আমরা চাই, ওর বিদায়টা হোক দারুণ।’ মেসির কাছের বন্ধু ও গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তো কথা বলতে গিয়ে চোখ মুছলেন প্রকাশ্যেই। বললেন, ‘আমরা চেষ্টা করবো ও যেন যতটা সম্ভব উপভোগ করতে পারে। তাকে ভালোবাসায় ভাসাবো, চুমুতে ভরিয়ে দেবো। সে যাতে খুশিমনে বিদায় নিতে পারে, সব চেষ্টা করবো।’ দলে এমন খেলোয়াড়ও আছেন, যারা কখনো মেসির সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করেননি। ২২ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড সান্তিয়াগো কাস্ত্রো বলেন, ‘এই প্রথম আমি মেসির সঙ্গে দেখা করবো। আমি বড় হয়েছি তাকে দেখে। তিনিই আমাকে বলের প্রেমে ফেলেছেন, জাতীয় দলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, এই জার্সির অর্থ বুঝিয়েছেন।’ আরেক তরুণ মাতিয়াস সুলে যোগ করলেন, ‘তিনি সারা বিশ্বের আইডল, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের নায়ক। ব্যাপারটা আমার জন্য দুঃখের, আবার একই সঙ্গে চমৎকার।’

মেসির এই বিদায়কে অমরত্ব দিতে অনন্য এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ)। বেনিনের বিপক্ষে এই ম্যাচে তার পরিহিত আইকনিক আর্মব্যান্ডটি ফুটবল ইতিহাসের এক চিরন্তন স্মারক হিসেবে দেশটির অন্যতম সুরক্ষিত জাদুঘরে স্থান পেতে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আর্মব্যান্ডটি আর কখনোই কেউ পরতে পারবে না; রূপান্তরিত হবে দেশটির অমূল্য জাতীয় স্মৃতিচিহ্নে। আগামীকাল বিশেষ এক জার্সি গায়ে চাপাবেন মেসি। ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা রঙের সেই জার্সির ঠিক মাঝখানে খোদাই করা হয়েছে দেশটির জাতীয় পতাকার সূর্যের প্রতীক। পাশাপাশি জার্সির পেছনে মেসির নাম এবং তার আইকনিক ১০ নম্বরটি লেখা হয়েছে সোনালি রঙে। বিদায়ী ম্যাচ শেষে এই বিশেষ জার্সিটি মেসির ব্যক্তিগত জাদুঘরে শোভা পাবে।

জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির এই বিদায় কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, এটি এক অমর উপাখ্যানের পূর্ণতা। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তার অর্জনগুলো চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর্জেন্টিনার হয়ে রেকর্ড ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮টি অ্যাসিস্ট। ১১টি হ্যাটট্রিকের মালিক তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২২ সালে কাতারে দেশকে সেই সোনালী ট্রফি এনে দেন তিনিই। এর আগে ও পরে আর্জেন্টিনাকে দুটি কোপা আমেরিকা (২০২১, ২০২৪) ও ফিনালিসিমা ট্রফিও এনে দেন এই মহাতারকা।

গত আগস্টে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন লিওনেল মেসি। দেশের মাটিতে ভক্তদের সামনে শেষবারের মতো খেলার জন্য গত শুক্রবার তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আর্জেন্টিনায় পৌঁছান। শুরুতে নিজের শহর রোজারিওতে পরিবারের সঙ্গে দুই দিন কাটান। এরপর বুয়েনস আয়ার্সে ফিরে সরাসরি যোগ দেন আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) মূল অনুশীলন মাঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগদানের কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে এএফএ। সেখানে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের পক্ষ থেকে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘সিনিয়র টিমে স্বাগত, অধিনায়ক’। সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় ‘ভরপুর রোমাঞ্চ’ শব্দ দুটি। পোস্টটি প্রকাশের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে বল পায়ে মেসির অনুশীলনের আরও কিছু দারুণ ছবি প্রকাশ করে এএফএ।