খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মূলধন ও সংরক্ষণ ঘাটতিতে দুর্বল ব্যাংক, অথচ কোথাও কোথাও পড়ে আছে উদ্বৃত্ত তারল্য। এই বৈপরীত্যই বলে দিচ্ছে- ব্যাংক খাতের সংকট শুধু টাকার নয়- বড় সংকট আস্থা, সুশাসন ও ব্যবস্থাপনায়।ব্যাংক খাতের এই নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আস্থা ফেরানো, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
বর্তমান সরকারও ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন ফেরানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান গুরুত্ব দিচ্ছেন খেলাপি ঋণ আদায় ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কম খরচে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর বিশ্লেষণ বলছে, মূলধন জোগান জরুরি হলেও ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সংস্কার ছাড়া নতুন মূলধনও পুরোনো ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে শেষ হয়ে যেতে পারে।
সিএসইআর এর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীমের মতে, ব্যাংক খাতে শুধু নতুন করে টাকা ঢাললেই সংকট কাটবে না। একই সঙ্গে বদলাতে হবে ঋণ দেয়ার সংস্কৃতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও খেলাপি ঋণ আদায়ের কাঠামো। কারণ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে এটি আর কেবল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। তার মতে ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে মূলধন জোগানের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং দ্রুত খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন। তার মতে, আমানতকারীর আস্থা নষ্ট হলে ব্যাংকের পাশাপাশি পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের ব্যাংক সংস্কার পরিকল্পনায় তাই দুর্বল ব্যাংককে অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখার পরিবর্তে প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন ও সংকট সমাধানের ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তিনি বলেন, আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষা এবং বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ওপরও জোর দেয়া হচ্ছে। কারণ ব্যাংক খাত সংস্কার করতে গিয়ে যদি প্রকৃত উদ্যোক্তার ঋণপ্রাপ্তি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উৎপাদন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, একদিকে দুর্বল ও অনিয়মগ্রস্ত ব্যাংকের সংস্কার, অন্যদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীর জন্য ঋণের দরজা খোলা রাখা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় সরাসরি কিছু পদক্ষেপের কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে একদিকে যেমন ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে অর্থায়ন সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। গভর্নর জানান, খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার রোধে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের চাপ কমানো। গভর্নর একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কম সুদের অর্থায়নের কথাও বলেছেন। ব্যাংকগুলোর নিষ্ক্রিয় আমানত ব্যবহার করে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ করে এসএমই ও কৃষি খাতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন তহবিল তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। সেখানে অনুদান এবং তুলনামূলক কম সুদের ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাত নিয়ে সিএসইআরের গবেষণা
সিএসইআর-এর চেয়ারম্যান, অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম সম্প্রতি দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট, চ্যালেঞ্জ এবং এ খাতের সম্ভাবনা নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। ঐ প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ব্যাংক কোন সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে তার প্রভাব নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট দুর্বল হলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে আমানতকারী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতিতে। কারণ ব্যাংক হলো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনব্যবস্থা। ঋণ থেকে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে আয় ও কর্মসংস্থান, আবার আয় থেকে সঞ্চয় হয়ে অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসে। এই চক্রের কোথাও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব আর ব্যাংকের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন ঠিক এমন একটি জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের জুন মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর অর্থ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ এমন অবস্থায় আছে, যেখান থেকে স্বাভাবিকভাবে অর্থের পুনঃচক্রায়ন হচ্ছে না। তবে সংখ্যাটিকে আরও সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে। ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর হওয়া, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পুনর্মূল্যায়ন এবং সম্পদের মান যাচাইয়ের ফলে আগের তুলনায় ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি এখন বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫.৭৩ শতাংশে উঠেছিল। ডিসেম্বর মাসে তা ৩০.৬ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পতনের বড় অংশ এসেছে ব্যাপক পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে, ঋণের প্রকৃত গুণগত উন্নতি থেকে নয়। ২০২৬ সালের মার্চে আবার অনুপাত বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশ এবং জুনে ৩২.৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রশ্ন হলো, কেন একটি অর্থনীতি এত বড় পরিমাণ ঋণকে এত দীর্ঘ সময়েও পুনরুদ্ধার করতে পারলো না? কেন ঋণ বিতরণের সময় ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলো না? কেন একটি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার পরও দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেয়া গেল না? কেন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি কাঠামো ঝুঁকির সংকেত আগে ধরতে পারলো না? আর কেন একটি ব্যাংকের মূলধন এতটা ক্ষয়ে যাওয়ার পরও সেটিকে কার্যত স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট অর্থের সংকট যতটা, তার চেয়েও বেশি সংকট তার সুশাসন, প্রণোদনার কাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রথম আঘাত আসে ব্যাংকের মুনাফায়। এরপর প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ বা প্রভিশনিং করতে হয়। প্রভিশনিং করতে গিয়ে মুনাফা ক্ষয় হয়, আয় কমে, মূলধন দুর্বল হয়। মূলধন দুর্বল হলে নতুন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ দুটোই কমে যায়। ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসার অর্থায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে ভালো ঋণও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ একদিকে ব্যাংককে দুর্বল করে, অন্যদিকে দুর্বল অর্থনীতি নতুন খেলাপি ঋণের জন্ম দেয়। এটি একটি চক্র। বাংলাদেশের সংরক্ষণ ঘাটতিও এই চক্রের গভীরতা দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে সংরক্ষণ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২২ লাখ কোটি টাকা। ছয় মাস আগে এই ঘাটতি ছিল ১.৯১ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বছরের প্রথম ছয় মাসেই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ না থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি সামাল দেয়ার সক্ষমতা কতটা, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
মূলধনের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ। সংকটটি ব্যাংকের ক্ষতি শোষণ করার সক্ষমতার ওপর বড় চাপের প্রতিফলন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এক কথায় তারল্য সংকটে আছে বলা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এসএলআর-এর অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৪.৮৪ শতাংশ বেশি।
সাম্প্রতিক এই বাস্তবতা থেকেই বোঝা যায়, শুধু নতুন টাকা ঢাললেই ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভবপর নয়। বরং, সেই টাকা কোথায় যাবে এবং কত দিন টিকবে সেটিও বিবেচনা করতে হবে। একটি দুর্বল ব্যাংকে মূলধন জোগান দেওয়া হলেও যদি তার পুরোনো সুশাসন কাঠামো, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি, অপর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং অদক্ষ ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নতুন মূলধন খুব দ্রুত পুরোনো ক্ষতি পূরণের কাজে ব্যয় হয়ে যেতে পারে।
ইউরোপের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আরও একটি শিক্ষা দেয়। ২০০৮ সালের পর ইউরোপীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনুৎপাদনশীল ঋণ বা ঘচখ দীর্ঘ সময় বড় সমস্যা ছিল। ECB ২০১৭ সালে NPL মোকাবিলায় আলাদা তদারকি নির্দেশনা দেয় এবং ব্যাংকগুলোকে বাস্তবসম্মত ঘচখ কমানোর কৌশল, সুশাসন কাঠামো, ঋণ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, সংরক্ষণ, হিসাব থেকে বাদ দেওয়া, জামানতের মূল্যায়ন এবং ঋণপত্র বা পোর্টফোলিও বিক্রির দিকে যেতে চাপ দেয়। সেখানে বিষয়টি কেবল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়নি; তদারকি সংস্থা, আদালত, আইনি কাঠামো এবং বিপর্যস্ত সম্পদের বাজার মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে বাস্তব সংকট-সমাধান প্রক্রিয়াতেও গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে টেকসইভাবে পরিচালনার অযোগ্য ঘোষণা করে সংকট সমাধান প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কারণগুলো উল্লেখ করেছে তার মধ্যে ছিল বড় মূলধন ঘাটতি, উচ্চ শ্রেণিকৃত সম্পদ, তারল্য চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতা।
তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এই সংস্কারগুলো যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে তা খেয়াল রাখা। খেলাপি ঋণের সমস্যায় আমাদের বহু বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন কিংবা নতুন করে সময় দেওয়া কোনো সমস্যাকে সাময়িকভাবে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ঋণ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করে না। ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে; তারপরও ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই ব্যবধানটি নীতিনির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
তাই বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সমন্বিত ব্যাংক খাত পুনর্গঠন কৌশল প্রয়োজন। প্রথম ধাপে প্রতিটি দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদমান নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে টেকসই কিন্তু মূলধনস্বল্প ব্যাংককে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ মূলধন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা দিতে হবে। তৃতীয় ধাপে দীর্ঘমেয়াদে অটেকসই ব্যাংকের জন্য একীভূতকরণ, হস্তান্তর, অস্থায়ী সেতু-ব্যাংক, অবসান বা অন্যান্য সংকট-সমাধান ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। চতুর্থ ধাপে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারকে আলাদা পেশাদার কার্যক্রম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং বিপর্যস্ত সম্পদের জন্য কার্যকর দ্বিতীয় বাজার তৈরি করতে হবে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে মূলধনস্বল্প ব্যাংকের জন্য মূলধন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সুশৃঙ্খল পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধানের ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর সঙ্গে সুশাসন সংস্কারকে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে।
বিশ্বের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। ব্যাংক সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসাবের খাতার শেষ লাইনে লেখা যায় না। তার শুরু হয় সঠিক ঋণ সিদ্ধান্তে, শক্ত সুশাসনে, সময়মতো ঝুঁকি শনাক্তকরণে এবং সমস্যাকে আড়াল না করার সাহসে। মূলধন ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে পারে, তারল্য ব্যাংককে চলতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসনই একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সেই সত্যটিকে নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য থাকতে হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি নতুন খেলাপি ঋণ তৈরির কারণও বন্ধ করতে হবে। মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে, কিন্তু কেন মূলধন ক্ষয় হলো সেই প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে। দুর্বল ব্যাংককে সহায়তা দিতে হবে, কিন্তু সেই সহায়তার সঙ্গে সংস্কার, জবাবদিহি ও সময়সীমা যুক্ত করতে হবে। তাহলেই ব্যাংক খাত আবার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে।
