রাশিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ করছে হোয়াইট হাউস। দেশটির একটি গবেষণাগারের এক টেকনিশিয়ান মারা যাওয়ার পর তার সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ মানুষকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এমন অবস্থায় উচ্চ সতর্কতায় আছে হোয়াইট হাউস। রোববার ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। প্রাদুর্ভাবটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো মূল্যায়ন করছে।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে আরও বলা হয়, ২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভা সাইবেরিয়ার ইরকুৎস্ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে কাজ করছিলেন। সেখানেই তিনি নিউমোনিক প্লেগের জীবাণুর সংস্পর্শে আসেন। সংবাদমাধ্যম লিউদি বাইকালার-এর তথ্য অনুযায়ী, জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকা একটি টেস্ট টিউব দুর্ঘটনাক্রমে ভেঙে যাওয়ার কথা চিকিৎসকদের জানিয়েছিলেন শিপিলোভা। এরপর সহকর্মীদের সঙ্গে বুরিয়াতিয়ায় একটি মাঠপর্যায়ের অভিযানে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বুরিয়াতিয়া রাশিয়ার মঙ্গোলিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত।
২৯শে সেপ্টেম্বর শিপিলোভাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়। কিন্তু এর দুই দিন পরই তার মৃত্যু হয়। শিপিলোভা প্রায় ২০০ মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন। প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কায় এখন তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এদিকে ওই অঞ্চলের তিনটি হাসপাতালে নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইরকুৎস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ জানিয়েছেন, পর্যবেক্ষণে থাকা ব্যক্তিদের কারও মধ্যে এ পর্যন্ত অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়নি এবং তাদের পরীক্ষায়ও প্লেগের সংক্রমণ ধরা পড়েনি বলে মস্কো টাইমস জানিয়েছে। শিপিলোভা যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেটিও কোয়ারেন্টিনের আওতায় রাখা হয়েছে।
অন্য হাসপাতালগুলোতে নেয়া হয়েছে শিপিলোভার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের। নিউমোনিক প্লেগ ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং রক্ত ওঠাসহ কাশি। সাধারণত সংস্পর্শে আসার তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে এসব উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। সংক্রমণের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে নিউমোনিক প্লেগে মৃত্যুর হার প্রায় ১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে চিকিৎসা না করা হলে এই রোগ প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী।
এদিকে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ ঠিক কী ঘটেছে, তা গোপন করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনগুলোতে দাবি করা হয়েছে, ওই অঞ্চলে রোগটির চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের মজুত ফুরিয়ে আসছে। এতে আতঙ্কিত বাসিন্দারা ওষুধের সরবরাহের দাবিতে ফার্মেসি ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন। তবে রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ মহামারি বিশেষজ্ঞ মিখাইল ফাভোরভ টেস্ট টিউব ভেঙে যাওয়ার ব্যাখ্যাটি নাকচ করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছে মস্কো টাইমস। ফাভোরভ বলেন, এটি হাস্যকর। ইরকুৎস্কের অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে কাজ করা কেউ প্লেগ প্রতিরোধী সুরক্ষা পোশাক পরেন। তিনি আরও বলেন, আপনি যদি একটি টেস্ট টিউব ভেঙেও ফেলেন, তাতে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা আসলে খুবই কম। সংক্ষেপে বললে, সাধারণ মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়- তারা টেস্ট টিউব ভেঙে যাওয়ার গল্পটিই বিশ্বাস করবে।
নিউমোনিক প্লেগ হলো ইয়েরসিনিয়া পোস্টিস নামের ব্যাকটেরিয়াজনিত প্লেগের তিনটি ধরনের একটি। এটি একজন আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে। প্লেগের দ্বিতীয় ধরন হলো সেপ্টিসেমিক প্লেগ। এটি মূলত সংক্রমিত মাছির কামড় অথবা সংক্রমিত প্রাণী ধরার মাধ্যমে রক্তে সংক্রমণ ঘটায়। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ এবং টিস্যু নেক্রোসিসের কারণে কালো হয়ে যাওয়া। তৃতীয় ধরন হলো বুবোনিক প্লেগ- যা ব্ল্যাক ডেথ নামেও পরিচিত। ১৬৬৫ সালের গ্রেট প্লেগের জন্য এই রোগই কুখ্যাতভাবে দায়ী ছিল। ওই মহামারিতে সে সময় ইউরোপের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। বুবোনিক প্লেগও মূলত মাছির কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাঁপুনি এবং বেদনাদায়ক ও ফুলে যাওয়া লসিকা গ্রন্থি, যেগুলোকে বুবো বলা হয়।
