ককপিটে দুই পাইলটের লড়াই, ‘হিরো’ পাইলট বাঁচালেন ১৭৪ প্রাণ, ভাসছেন প্রশংসায়

ককপিটে দুই পাইলটের লড়াই, ‘হিরো’ পাইলট বাঁচালেন ১৭৪ প্রাণ, ভাসছেন প্রশংসায়

ফন্ট সাইজ:

ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের সাহসিকতায় রক্ষা পেয়েছেন ফ্লাইদুবাইয়ের কমপক্ষে ১৭৪ জন আরোহী। দুবাই থেকে তেল আবিবগামী বিমানে বুধবার দু’জন পাইলট ছিলেন। তাদের মধ্যে আকস্মিক ককপিটে কথা কাটাকাটি থেকে ‘লড়াই’ শুরু হয়ে যায়। এ সময় বিমানটি কয়েক হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। এরই মধ্যে এক পাইলট অন্যজনকে ছুরিকাঘাত করেন। ততক্ষণে আরোহীদের কিছু সংখ্যক ছুটে গিয়ে হামলাকারী পাইলটকে আটক করে। ওই বিমানে আরোহীদের বেশির ভাগই ছিল ইসরাইলি। এ ঘটনার পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, বিমানটি ‘সম্ভবত বিধ্বস্ত করার চেষ্টা’ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় এক পাইলটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ খবর দিযেছে অনলাইন বিবিসি।
ঘটনার সময় যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে পরাস্ত করে ফ্লাইদুবাই-এর বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন। পরে ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমে তাবুক বিমানবন্দরে। বুধবার পরে প্রায় সব ইসরাইলি যাত্রীকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে করে তেল আবিবে নিয়ে যাওয়া হয়। ছুরিকাঘাতে আহত পাইলট একজন ভারতীয়। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তার প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তারা তাকে ‘হিরো’ বা বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এক্সে দেয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু লিখেছেন, ছুরিকাহত হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পরও মাচ্ছার পাল্টা লড়াই করেছেন, প্রতিরোধ করেছেন, ককপিটের দরজা খুলেছেন এবং যাত্রী ও ক্রুদের হামলাকারীকে পরাস্ত করতে সক্ষম করেছেন। এর মাধ্যমে আকাশে ভয়াবহ একটি বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, ইসরাইলি নাগরিকসহ ১৭৪ জনের জীবন তিনি বাঁচিয়েছেন। সৌদি আরবে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, মাচ্ছারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তার অবস্থা স্থিতিশীল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্সে লিখেছেন, চরম বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত থাকা সত্ত্বেও তিনি অসীম সাহস ও অন্যদের জীবন রক্ষায় অটুট সংকল্পের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে নিয়ে ভারত গর্বিত।

তবে কি কারণে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে ওই ‘লড়াই’ তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে বুধবার রাতে ফক্স নিউজকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সৌদি আরবে ওই পাইলটের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পরে তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখান থেকে বিমানটি উড্ডয়ন করেছিল। নেতানিয়াহু আরও জানিয়েছেন, তদন্তে ইসরাইলও সম্ভবত অংশ নেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ঘটনার পর তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, হামলাকারী একজন সন্ত্রাসী হতে পারে, অথবা হামলার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজও ঘটনাটিকে ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এর পক্ষে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।

ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৭:০৫ মিনিটে উড্ডয়ন করে। এর গন্তব্য ছিল ইসরাইলের বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দর। যাত্রা শুরুর প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। দুই মিনিটেরও কম সময়ে বিমানটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। কয়েক মিনিট পর বিমানটি জরুরি সংকেত কোড- স্কোয়াক ৭৭০০ পাঠায়। এরপর সেটি পরিবর্তন করে স্কোয়াক ৭৫০০ কোড দেয়া হয়, যার মাধ্যমে বিমান ছিনতাইয়ের সংকেত জানানো হয়। এই সংকেত দেয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর বিমানটি ঘুরে সৌদি আরবের দিকে যায়। পরে সেখানে বিমানটি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অবতরণের প্রস্তুতি নেয়।

ঘটনার পরপরই ইসরাইল ও সৌদি আরবের বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান পাঠায়। একই সময়ে নেতানিয়াহু জরুরি বৈঠক করেন। প্রাথমিক খবরে বলা হয়েছিল, বিমানের দুই পাইলটের মধ্যে মারামারি শুরু হয়েছিল। এ কারণেই বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে এসে অবতরণ করতে বাধ্য হয় বলে ধারণা করা হয়। তবে বিমানটি তাবুকে অবতরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং নেতানিয়াহুর দেয়া বিবৃতিতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। জানা যায়, একজন পাইলট অপর পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি সম্ভবত বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। নেতানিয়াহু জানান, বিমানের এক ইসরাইলি যাত্রী তাকে বলেছেন, বিমানটি ঘুরতে শুরু করেছিল এবং নিচে নামছিল। এরপর ওই যাত্রী ও একজন ক্রু ককপিটে ঢুকে ছুরিকাঘাতকারী পাইলটকে পরাস্ত করেন।

ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, বিমানে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই ক্রু এরপর বিমানটির নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত করেন। বুধবার সন্ধ্যায় দেয়া এক বক্তব্যে নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ’ বজায় রাখছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো নেতানিয়াহুও হামলার কোনো উদ্দেশ্য জানাননি। তিনি বলেন, এই বীরদের আমি অভিবাদন জানাই। তারা অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তারা বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকিয়েছেন।

ফ্লাইদুবাই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফ্লাইট ডেকে একটি হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। পরে বিমানে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত ফ্লাইদুবাইয়ের ক্রুরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করান। এয়ারলাইনটির এক মুখপাত্র বলেছেন, এই ঘটনায় জড়িত সব যাত্রী ও ক্রুর চলমান নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিশ্চিত করাই আমাদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে আমরা সরকারি তদন্তে সহযোগিতা করছি।

এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটের যাত্রীরা স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে তেল আবিবে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়। তারা গান বাজাচ্ছিলেন, গান গাইছিলেন, নাচছিলেন এবং ইসরাইলের পতাকা উড়াচ্ছিলেন। ইসরাইলের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের এক প্যারামেডিক জানিয়েছেন, অনেক মানুষকে বিমান থেকে নামার সময় অত্যন্ত আবেগাপ্লুত ও কাঁদতে দেখা গেছে। বিমানের এক যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান, তিনি ও বিমানের অন্য কয়েকজন যাত্রী কীভাবে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক ভিডিওতে হায়ুন বলেন, যে পাইলটকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল, তিনি দরজার একেবারে কাছে ছিলেন। তাই আমাদের জন্য দরজা খোলা কঠিন ছিল। তবে ছুরিকাহত পাইলট চেতনা হারিয়ে পড়ে যাওয়ার আগে ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। ইয়ানিভ জানান, বিমানটি অচল করে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন এমন হামলাকারীকে তিনি গলা চেপে ধরে নিয়ন্ত্রণে নেন। পরে অন্য যাত্রীরাও এগিয়ে এসে তাকে মাটিতে চেপে ধরেন। তিনি আরও জানান, তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধরে টান দেন। এরপর বিমানটি সমতল অবস্থায় এলে আরেক পাইলট এর নিয়ন্ত্রণ নেন।

আরেক যাত্রী জভিকা মেনেস ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান নিউজকে বলেছেন, তিনি এবং অন্য যাত্রীরা হামলাকারীকে তার নিজের জিপ-টাই এবং মাল্টিমিডিয়া হেডফোন দিয়ে বেঁধে ফেলেন। তিনি বলেন, এখানে শিশু ও পরিবার রয়েছে, যারা অত্যন্ত ভয়াবহ ও গভীরভাবে আঘাতকারী একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছে।