আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমান (৪৭) কে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৪ (এসআরবি)। গত ২৮শে সেপ্টেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগরীর বনানী সি ব্লক এলাকায় এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করে। মঙ্গলবার (২৯শে সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাওরান বাজারের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এসআরবি-৪ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, গত ১৬ই জুলাই মানব পাচার চক্রের প্রতারণার শিকার কামরুন নাহার ফাতেমা নামে একজন ভুক্তভোগী মিশর থেকে আমাদের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভুক্তভোগী জানান, একটি মানব পাচার চক্র তাদেরকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে মিশরে নিয়ে আটকে রেখেছে। কামরুন নাহার এবং তার পরিবারের মোট পাঁচজন সদস্যকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে গ্রেপ্তারকৃত আরজু তাদের নিকট থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেয় এবং তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে নাÑ এই কথা বলে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যায়। শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার পর তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করে। অত্যাচারিত হয়ে তার পরিবারের তিনজন ছেলে সদস্য কোনোভাবে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসে। পরিবারের আরেক সদস্য আঞ্জুমান আরা সেখান থেকে পালিয়ে এখনো শ্রীলঙ্কাতেই কোনো একটি জায়গায় রয়েছে। আর কামরুন নাহার ফাতেমাকে তারা শ্রীলঙ্কা থেকে ভিসা হবে না বলে মিশরে নিয়ে যায়।
মিশরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হয় এবং তাদেরকে অনৈতিক কাজের জন্য বাধ্য করা হয়। একটা পর্যায়ে তারা যখন এগুলো করতে অস্বীকার করছিল, তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হয়। এমনকি তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে সিগারেট দিয়ে ছ্যাঁকা দেয়া হয়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে এনএসআই কর্তৃক গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করা হয়। এই আরজু নামক ব্যক্তি তখন মিশরে ছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে তাকে ট্র্যাক করা হচ্ছিল যে, সে কবে বাংলাদেশে আসে। গত তিন-চার দিন আগে সে বাংলাদেশে আসে এবং আগামী বৃহস্পতিবার আবার মিশরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। এনএসআই-এর তথ্যের ভিত্তিতে আমরা তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।
জিজ্ঞাসাবাদে আরজু জানায়, সে প্রায় ১২ বছর ধরে এ ধরনের অবৈধ আদম ব্যবসা ও মানব পাচারের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রায় দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি মানুষকে সে এই ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে প্রায় ৩০-৩৫ জন ভুক্তভোগী, যারা পালিয়ে দেশে ফেরত এসেছে, তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ দায়ের হয়েছে। আরজুর নিজস্ব কোনো লাইসেন্স নেই। সে আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’, ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন ভুয়া নাম ব্যবহার করে গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের বোকা বানিয়ে তাদেরকে ইউরোপের কথা বলে বিভিন্ন দেশে নিয়ে বিক্রি করে দিতো এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করতো।
এসআরবি-৪ এর অধিনায়ক বলেন, গ্রেপ্তারকৃতের মোবাইলের ভেতরে তার একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট পাই আমরা, যেখানে গত এক বছরের মধ্যে তার ট্রানজেকশন ছিল অলমোস্ট ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার উপরে। এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যে ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে র্যাব এবং এসআরবি কর্তৃক ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী যে কামরুন নাহার ফাতেমা এবং আঞ্জুমান আরা, যারা শ্রীলঙ্কা এবং মিশর থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তাদের কষ্টের কথা জানিয়েছে, তাদেরকে দেশে ফেরত আনার জন্য যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। গ্রেপ্তারকৃত আসামি মোহাম্মদ আরজু রহমানের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সহযোগী এবং মানব পাচার চক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
