সায়াটিকা আসলে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়, এটি একটি উপসর্গসমষ্টি। মানবদেহের সবচেয়ে বড় স্নায়ু ‘সায়াটিক নার্ভ’ যখন চাপের মুখে পড়ে বা প্রদাহগ্রস্ত হয়, তখন কোমরের নিচের অংশ থেকে নিতম্ব হয়ে পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, ঝিনঝিন, অবশভাব কিংবা দুর্বলতা দেখা দেয়, যা সায়াটিকা নামে পরিচিত।
কারণ
সায়াটিক নার্ভের সংকোচনের কারণে সায়াটিকা হতে পারে। এই সংকোচন সাধারণত ঘটে যখন মেরুদণ্ডের ডিস্ক সরে যায় বা ডিস্ক হার্নিয়েশন ঘটে। তবে স্পাইনাল স্টেনোসিস বা মেরুদণ্ডের নালির সংকীর্ণতা, বয়সজনিত ক্ষয় ও অস্থির পরিবর্তন, মেরুদণ্ডে আঘাত, অতিরিক্ত ওজনের কারণে কোমরের ওপর চাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিংবা দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করাও সায়াটিকার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া পিরিফর্মিস সিন্ড্রোমের কারণেও নার্ভে চাপ পড়তে পারে, যা সায়াটিকার সমস্যা তৈরি করে। মেরুদণ্ডের আশপাশে টিউমার বা চাকা (যেমন: ক্যানসার), রক্ত জমাট বাঁধা (এপিডুরাল হেমাটোমা) কিংবা পুঁজ হওয়া (এপিডুরাল অ্যাবসেস)—ইত্যাদি কারণেও স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়ে সায়াটিকার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
লক্ষণ
সায়াটিকার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো কোমর থেকে এক পাশের নিতম্ব ও পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ব্যথা। অনেক সময় রোগী স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে, দাঁড়াতে বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে অস্বস্তি অনুভব করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে অথবা পায়ে জ্বালাপোড়া ও অবশভাব দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন অবহেলা করলে পরবর্তীতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে ?
সাধারণত ব্যক্তির বয়স, ওজন, পেশা এবং জীবনযাত্রার অভ্যাস সায়াটিকার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যেমন—যারা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেন এবং যাদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রয়েছে, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেরুদণ্ডের ডিস্ক হার্নিয়েশন ও বোন স্পার (Bone Spur)-এর সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও যাদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে এবং যারা ভুল ভঙ্গিতে কাজ করেন কিংবা ভারী জিনিস বহন করেন, এমন শ্রমজীবী মানুষের এই সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে অফিসকর্মী, চালক এবং ভারী শ্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
ফিজিওথেরাপির ভূমিকা
সায়াটিকা ব্যবস্থাপনায় ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতি। রোগীর সমস্যার ধরন ও তীব্রতা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত ব্যায়াম, ম্যানুয়াল থেরাপি, শারীরিক ভঙ্গি (Posture) সংশোধনের মাধ্যমে ব্যথা কমানো ও স্নায়ুর ওপর চাপ হ্রাস করা সম্ভব। পাশাপাশি পেশির শক্তি ও নমনীয়তা বৃদ্ধি করে রোগীকে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতেও ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক রোগনির্ণয় ও ফিজিওথেরাপিভিত্তিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ রোগী অস্ত্রোপচার ছাড়াই সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
প্রতিরোধে করণীয়
সায়াটিকার সমস্যা প্রতিরোধে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি। যেমন—সামনের দিকে ঝুঁকে ভারী কোনো কাজ করা যাবে না। দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে, সঠিক ভঙ্গিতে কাজ করতে হবে এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে রাখতে হবে। শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং ভারী জিনিস তোলার সময় সঠিক কৌশল অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক
উম্মেছালমা
বাত-ব্যথা, প্যারালাইসিস, স্পোর্টস ইনজুরি ও ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ।
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-পল্লবী
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯
