দেশের বৃহত্তম নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ৩ হাজার ২২০টি মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৮৫৪ জন। ফলে রেলওয়ে কারখানায় তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ না করায় নিয়মিত মেরামত হচ্ছে না কোচ। ফলে লক্কর-ঝক্কর কোচে চলছে যাত্রীদের রেলসেবা কার্যক্রম। রাজশাহী থেকে নীলফামারীর চিলাহাটিগামী আন্তঃগর বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি কোচের স্প্রিং ভেঙে বগি লাইনচ্যুত হয়। অতিসম্প্রতি এ দুর্ঘটনা ঘটে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে। শুধু বরেন্দ্র ট্রেনই নয়, এমন ছোট-বড় দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনে। এসব ট্রেন যেখানে মেরামত করা হয়, সেই সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নেই পর্যাপ্ত জনবল। ফলে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে ট্রেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, জনবলের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কোচ মেরামত এবং উৎপাদন কার্যক্রম আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
এ কারণে পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগ এখন পুরোপুরি বিপর্যয় ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে ট্রেনের এক পরীক্ষক জানান, ট্রেনের ওজন বহনকারী স্প্রিং নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর বদলানোর কথা। কিন্তু তা না বদলে তার নিচে প্লেট বা প্যাকিং দিয়ে উচ্চতা বাড়ানো হয়। ফলে অল্প দিনেই প্যাকিং খুলে যাচ্ছে। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আওতায় ৬৬টি আন্তঃনগর ও ৬০টি মেইল ট্রেন দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এসব ট্রেনে ৮১৮টি কোচ জুড়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে ৯৫৬টি ব্রডগেজ ও ২০০টি মিটারগেজ ট্রেন চলাচল করছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভিন্ন রুটে। এগুলোর মধ্যে ২০০৬ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা সাদা ৫০টি ব্রডগেজ, লাল-সবুজ ১০০টি ব্রডগেজ ও ৫০টি মিটারগেজ কোচ রয়েছে। এ ছাড়া ভারতীয় লাল-সবুজ ১২০টি কোচ রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে ৪৫ বছর আগে জার্মানি, ডেনমার্ক, পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ৪৪৮টি ব্রডগেজ কোচ। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সূত্র জানায়, কারখানায় ৩ হাজার ২২০টি মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৮৫৪ জন; যা মোট পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
এ ছাড়া কাঁচামালের অভাবে প্রতিদিন ২টি বগি মেরামত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। কারখানা সূত্র জানায়, দক্ষ কারিগর ও অর্থ বরাদ্দের অভাবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ৭৪৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ৬০০টি অলস পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ক্যারেজ শপের ইনচার্জ মমিনুল ইসলাম বলেন, চাহিদা অনুযায়ী জনবল থাকলে কোচ আমদানি করতে হতো না। এতে প্রতিবছর শতকোটি টাকা সাশ্রয় হতো রেলের। একই অবস্থা চলছে কারখানাটির ওয়াগন শপে। সরজমিন দেখা গেছে, চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর হয়ে খুলনা ও রাজশাহী চলাচলকারী আন্তঃনগর সীমান্ত, রূপসা, বরেন্দ্র ও তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনের কোচগুলো বেহাল। প্রতিটি কোচ জরাজীর্ণ। বাথরুমের ফিটিংস ভালো নেই; ফলে ব্যবহারের অনুপযোগী টয়লেট। কারখানা সূত্র বলছে, এসব কোচ মেরামতের কথা থাকলেও তা করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফী নূর মোহাম্মদ বলেন, দেশের বৃহত্তম এই রেলওয়ে কারখানায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে শ্রমিকেরা অতিরিক্ত সময় কাজ করে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। তবে এখানে বড় সমস্যা প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সৈয়দপুর রেলওয়ের স্টেশনমাস্টার ওবাইদুল ইসলাম বলেন, যান্ত্রিক ক্রটির কারণে এই রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর একাধিক কোচ খুলে রাখা হয় মাসের পর মাস। এতে আমরা স্বল্প দূরত্বের কোনো স্টেশনের টিকিটই দিতে পারছি না।এতে রেলওয়ে রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রেনের যান্ত্রিক ক্রটির কারণে এ রুটে প্রায়ই শিডিউল বিপর্যয় হয়।
