হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিবার। কারও হাতে পুরোনো ব্যবস্থাপত্র, কারও হাতে ফোন। কিছুক্ষণ আগেও যিনি সংসারের খোঁজ নিয়েছেন, সন্তানের সঙ্গে কথা বলেছেন, আগামী দিনের পরিকল্পনা করেছেন—তিনি এখন তীব্র বুক ব্যথায় কাতর। স্বজনেরা চিকিৎসকের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের সব প্রশ্ন যেন একটি বাক্যে এসে থেমেছে: মানুষটিকে বাঁচানো যাবে তো?
চিকিৎসকের সামনে ইসিজি। মনিটরে হৃদ স্পন্দন। আর শরীরের ভেতরে, চোখের আড়ালে, অক্সিজেনের অভাবে বিপন্ন হচ্ছে হৃদ পেশি। বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারের কাছে সময় তখন উদ্বেগের দীর্ঘ প্রহর। চিকিৎসকের কাছে প্রতিটি মিনিট জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা নেয়ার মূল্যবান সুযোগ।
হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে দু’টি কাল্পনিক দৃশ্যের কথা ভাবা যাক। এগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ঘটনা নয়; জরুরি সিদ্ধান্ত ও বিলম্বের সম্ভাব্য পরিণতি বোঝানোর উদাহরণ। প্রথম দৃশ্যে একজন মানুষ বুকে তীব্র চাপ, ঘাম ও অস্বস্তি নিয়ে হাসপাতালে এলেন। দ্রুত মূল্যায়নের পর চিকিৎসক জানালেন, তার এমন ধরনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, যাতে জরুরি প্রাইমারি পিসিআই করে আক্রান্ত ধমনিতে রক্ত প্রবাহ ফিরিয়ে দেয়া প্রয়োজন। চিকিৎসার সুফল, ঝুঁকি, বিকল্প এবং অপেক্ষার বিপদ বোঝানো হলো।
কিন্তু রোগী দ্বিধায় পড়লেন। বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার ইচ্ছা জানালেন। স্বজনেরা যোগাযোগ শুরু করলেন, যাত্রার সম্ভাবনা খুঁজলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রিয় মানুষটির জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অথচ সেই ভালো চাওয়ার মধ্যেই সময় পেরিয়ে গেল। হৃদ পেশিতে রক্তের অভাব চলতে থাকল। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলো। শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো গেল না।
দ্বিতীয় দৃশ্যে একই ধরনের জরুরি অসুস্থতায় আক্রান্ত আরেকজন চিকিৎসকের ব্যাখ্যা শুনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় সম্মতি দিলেন। প্রস্তুত দল তাকে ক্যাথল্যাবে নিয়ে গেল। আক্রান্ত ধমনিতে রক্ত প্রবাহ ফিরিয়ে দেয়া হলো। প্রয়োজনীয় ওষুধ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী চিকিৎসায় তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন। একদিন পরিবারের হাত ধরে বাড়ি ফিরলেন। একটি পরিবার প্রিয়জনকে হারাল। অন্য পরিবার ফিরে পেল একসঙ্গে বেঁচে থাকার আরও কিছু সময়।
তবে বাস্তব জীবনের ফলাফল এত সরল সমীকরণে নির্ধারিত হয় না। রোগের তীব্রতা, আগে ঘটে যাওয়া ক্ষতি, অন্যান্য অসুস্থতা, জটিলতা এবং চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। সময় মতো চিকিৎসা দিয়েও সব রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। এই গল্পের উদ্দেশ্য রোগী বা পরিবারকে দোষারোপ করা নয়; কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ যেন অপ্রয়োজনীয় বিলম্বে হারিয়ে না যায়, সেই উপলব্ধি তৈরি করা।
২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। ২০২৬ সালের প্রচারাভিযানের মূল “Don’t Miss a Beat-Heart Disease Can Hide in Plain Sight”—আপাত সুস্থতার আড়ালেও হৃদ রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে।
বিশ্ব হার্ট ফেডারেশন সতর্ক সংকেত চেনা, হৃদ স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা এবং কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের জীবনে এই আহ্বানের ব্যবহারিক মর্মার্থ হোক: সংকেত চিনুন, ঝুঁকি জানুন, সময় মতো পদক্ষেপ নিন।
এই বার্তা ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কথাও বলা হয়েছে। মানুষ বিপদের সংকেত চিনবেন, দ্রুত সাহায্য চাইবেন; স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তাকে যথাসময়ে উপযুক্ত চিকিৎসায় পৌঁছে দেবে। প্রতিরোধ, জরুরি চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যাকে একই ধারাবাহিক ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে হৃদ রোগ ও রক্তনালীর রোগে বিশ্বে আনুমানিক ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এসব মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটেছে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে। তিন-চতুর্থাংশের বেশি মৃত্যু ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, প্রিয়জন হারানোর শোক এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তা। হৃদ রোগ প্রতিরোধ তাই পারিবারিক নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নেরও বিষয়।
হৃদ্স্বাস্থ্যের যত্ন শুরু হয় নিজের ঝুঁকি জানা থেকে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অনেকের কোনো অসুবিধা হয় না। ডায়াবেটিস ও ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বৃদ্ধিও দীর্ঘদিন অজানা থাকতে পারে। নিয়মিত হাঁটেন কিংবা ধূমপান করেন না—এমন মানুষেরও অন্য ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই উপসর্গের অনুপস্থিতিকে ঝুঁকির অনুপস্থিতি মনে করা ঠিক নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং বিদ্যমান অসুস্থতা অনুযায়ী রক্তচাপ, শর্করা ও কোলেস্টেরল মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রতিরোধের দৈনন্দিন ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, তামাক বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও মাছের স্থান বাড়াতে হবে; কমাতে হবে অতিরিক্ত লবণ, চিনিযুক্ত পানীয় ও ক্ষতিকর চর্বি। ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল ও অন্যান্য তামাকও বর্জন করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের পরোক্ষ ধূমপান থেকে রক্ষা করাও দায়িত্বের অংশ।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম—যেমন দ্রুত হাঁটা—একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। সামর্থ্য অনুযায়ী সময় বাড়ানো এবং সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম উপকারী। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার অভ্যাসও কমাতে হবে। যাদের হৃদরোগ বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাদের ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।
প্রতিরোধের পাশাপাশি বিপদের সংকেত চেনা জরুরি। বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি বা ব্যথা; বাহু, পিঠ কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া অস্বস্তি; শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা বমিভাব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। সব রোগীর তীব্র বুক ব্যথা হয় না। সন্দেহজনক উপসর্গকে ‘গ্যাস’ ধরে নিয়ে অপেক্ষা করা কিংবা ব্যথা কমে যাওয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মনে করা উচিত নয়। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
হৃদ্পিণ্ড সারা শরীরে রক্ত পাঠালেও তার নিজের পেশির জন্যও নিরবচ্ছিন্ন রক্ত ও অক্সিজেন দরকার। এই সরবরাহ আসে করোনারি ধমনির মাধ্যমে। অনেক হার্ট অ্যাটাকে ধমনির ভেতরের প্ল্যাক ফেটে বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে রক্ত জমাট বাঁধে। রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে হৃদ পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বিলম্বে ক্ষতি বাড়তে পারে; দেখা দিতে পারে হৃদ্যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা বিপজ্জনক অনিয়মিত হৃদ স্পন্দন। এ কারণেই বলা হয়, “Time is muscle”—সময় হারানোর সঙ্গে কার্যকর হৃদ পেশিও হারিয়ে যেতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসার লক্ষ্য এই ক্ষতি যত দ্রুত সম্ভব সীমিত করা। প্রাইমারি পিসিআইয়ে জরুরি ক্যাথেটার ভিত্তিক পদ্ধতিতে আক্রান্ত ধমনিতে রক্ত প্রবাহ ফিরিয়ে দেয়া হয়। সাধারণত কবজি বা কুঁচকির ধমনি দিয়ে সরু ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে বাধার স্থান শনাক্ত করা হয়; এরপর বেলুন ও প্রয়োজন মতো স্টেন্ট ব্যবহার করা হয়। মানুষের কাছে এটি ‘হার্টে রিং পরানো’ নামে পরিচিত। এর জীবন রক্ষাকারী তাৎপর্য হলো বিপন্ন হৃদ পেশিকে আবার রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ দেয়া। বর্তমানে AHA (আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন)-২০২৫ এর এবং ESC (ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজির)-২০২৩ এর গাইডলাইন অনুযায়ী দ্রুত মূল্যায়ন, উপযুক্ত রোগীর সময় মতো রক্ত প্রবাহ পুনঃস্থাপন এবং পরবর্তী পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সন্দেহভাজন তীব্র করোনারি সমস্যায় ফার্স্ট মেডিকেল কন্টাক্ট এর ১০ মিনিটের মধ্যে ইসিজি করা ও মূল্যায়নের লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। তবে সব হার্ট অ্যাটাকের চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় ওই সময়েই সম্ভব হয় না; প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় ইসিজি, ট্রোপোনিন পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ লাগে। সময় সীমার মধ্যে দক্ষ দলের মাধ্যমে করা সম্ভব হলে এসটি-এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা এসটিইএমআই (ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক)-এ প্রাইমারি পিসিআই গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা। ২০২৫ সালের AHA নির্দেশিকায় উপযুক্ত রোগীর ফার্স্ট মেডিকেল কন্টাক্ট থেকে পিসিআইয়ের প্রথম যন্ত্র প্রয়োগের লক্ষ্য সরাসরি সক্ষম কেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে ৯০ মিনিটের মধ্যে এবং অন্য হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর প্রয়োজন হলে ১২০ মিনিটের মধ্যে। এগুলো চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্রুততার মানদণ্ড; রোগী বা পরিবারকে অপেক্ষা করার সময় দেয় না।
জাতীয় সেবা ব্যবস্থায় বিকল্প চিকিৎসা পথও প্রস্তুত রাখতে হবে। সময় মতো প্রাইমারি পিসিআই সম্ভব না হলে উপসর্গ শুরুর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসা উপযুক্ত এসটিইএমআই রোগীর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা যাচাই করে জমাট গলানোর ওষুধ এবং পিসিআই কেন্দ্রে স্থানান্তরের ব্যবস্থা প্রয়োজন। ওষুধ ব্যর্থ হলে জরুরি রেসকিউ পিসিআই; সফল হলে সাধারণত ২–২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাঞ্জিওগ্রাম ও প্রয়োজন মতো পরবর্তী চিকিৎসা করা হয়। এসটি-এলিভেশন ছাড়াও অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির রোগীর জরুরি অ্যাঞ্জিওগ্রাম লাগতে পারে। এসব সিদ্ধান্ত প্রশিক্ষিত চিকিৎসা দল নেবে। এখানে একটি ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন। হার্ট অ্যাটাকের চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে চিকিৎসার আর সুযোগ থাকে না—এ কথা সঠিক নয়। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু চার ঘণ্টা কোনো চূড়ান্ত সীমারেখা নয়। চলমান রক্ত স্বল্পতা শক বা গুরুতর অস্থিতিশীলতায় আরও পরেও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। দেরি হয়েছে ভেবে চিকিৎসা নেয়া থেকে বিরত থাকা বিপজ্জনক।
বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার পরিকল্পনাকেও এই জরুরিতার আলোকে দেখতে হবে। পরিকল্পিত চিকিৎসায় পছন্দের কেন্দ্র নির্বাচনের সুযোগ থাকে। কিন্তু তীব্র হার্ট অ্যাটাকে যাত্রার প্রস্তুতি ও দীর্ঘ স্থানান্তরের বিলম্ব ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কাছেই উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া গেলে সেটি পিছিয়ে দেয়ার পরিণতি রোগী ও পরিবারকে সহজ ভাষায় বোঝানো দরকার। স্থানান্তর প্রয়োজন হলে তা হতে হবে চিকিৎসা দলের পরামর্শে এবং গ্রহণকারী কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে।
এই আলোচনা হবে সহমর্মিতাপূর্ণ। রোগীর ভয়, প্রশ্ন ও দ্বিধাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কী হয়েছে, এখন কী করা প্রয়োজন, চিকিৎসার ঝুঁকি কী এবং অপেক্ষায় কী বিপদ হতে পারে—এসব স্পষ্টভাবে বোঝানো জরুরি। রোগীর অবহিত সিদ্ধান্ত, আস্থা ও অংশগ্রহণ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে রোগীর দ্রুত সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দ্রুত সাড়াও প্রয়োজন। সম্মতি দেয়ার পরও যদি প্রস্তুত দল না পাওয়া যায়, অ্যাম্বুলেন্স না মেলে কিংবা বারবার হাসপাতাল বদলাতে হয়, তাহলে সচেতনতার সুফল সীমিত থেকে যায়। এই ব্যবধান কমাতে আমি একটি জাতীয় তীব্র করোনারি রোগ সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব করছি।
এই নেটওয়ার্কে কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা পর্যায়ে ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং সতর্ক সংকেত সম্পর্কে শিক্ষা থাকবে। উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত ইসিজি, দূরবর্তী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন সক্রিয় করার সক্ষমতা প্রয়োজন। জেলা হাসপাতালে প্রশিক্ষিত দল, পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত ক্ষেত্রে ওষুধ ভিত্তিক রক্ত প্রবাহ পুনঃস্থাপন এবং দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পুরোনো ১৯টি বৃহত্তর জেলা এলাকাকে পরিকল্পনার সূচনাবিন্দু ধরে ১৫ টি আঞ্চলিক হৃদ রোগ কেন্দ্রের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কেন্দ্রের সংখ্যা ও অবস্থান চূড়ান্ত হবে জনসংখ্যা, যাতায়াতের সময়, বিদ্যমান সক্ষমতা এবং সেবা বঞ্চিত এলাকার চাহিদা বিশ্লেষণ করে। বিভাগীয় উচ্চতর কেন্দ্রগুলো জটিল চিকিৎসা ও কার্ডিয়াক সার্জারির সহায়তা দেবে। জাতীয় সমন্বয় ব্যবস্থা সেবার সক্ষমতা, স্থানান্তর ও মান পর্যবেক্ষণ করবে। এই স্তরগুলো রোগীর বাধ্যতামূলক যাত্রাপথ হবে না। উপযুক্ত রোগীকে সরাসরি সক্ষম কেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। প্রতিটি স্তরে ঘুরিয়ে পাঠালে নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
দূরবর্তী ইসিজি মূল্যায়ন, ইলেকট্রনিক রেফারেল, অ্যাম্বুলেন্সের অবস্থান এবং শয্যা ও ক্যাথল্যাবের প্রস্তুতির তথ্য বিনিময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি সক্ষমতা যুক্ত করতে প্রয়োজন স্বচ্ছ চুক্তি, নির্ধারিত সেবামূল্য এবং দরিদ্র রোগীর আর্থিক সুরক্ষা। যন্ত্রপাতির সঙ্গে সার্বক্ষণিক জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, ওষুধ ও পরিবহনের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই ব্যবস্থার সাফল্য মাপতে হবে রোগীর প্রাপ্ত সেবায়। কত দ্রুত ইসিজি হলো, স্থানান্তরে কত সময় লাগল, কতজন উপযুক্ত চিকিৎসা পেলেন এবং চিকিৎসার ফল কেমন হলো—এসব নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। রোগীর ঝুঁকির পার্থক্য বিবেচনা ছাড়া মৃত্যুহার দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সরল তুলনা করা উচিত নয়। তথ্যের উদ্দেশ্য হবে দুর্বলতা শনাক্ত করে সেবার উন্নতি করা। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পরও পরিচর্যা চলবে। নির্ধারিত ওষুধ, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য ঝুঁকির নিয়ন্ত্রণ এবং কার্ডিয়াক পুনর্বাসন দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিরাপদ ব্যায়াম, মানসিক সহায়তা ও কাজে ফেরার পরিকল্পনায় রোগীকে সাহায্য করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
রাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক দায়িত্বও স্পষ্ট। তামাক নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ ও শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট কমানো, বায়ুদূষণ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরামর্শ দেয়ার সঙ্গে সেই জীবনযাপনের সুযোগও সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বিশ্ব হার্ট দিবসের সাফল্য তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন একজন মানুষ অজানা উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসায় যুক্ত হবেন; একটি পরিবার বুকের অস্বস্তিকে অবহেলা না করে সাহায্য চাইবে; একটি উপজেলা হাসপাতাল দ্রুত ইসিজি পাঠিয়ে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে; আর একজন সংকটাপন্ন রোগী অর্থ বা সমন্বয়ের অভাবে জীবন রক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না। ক্যাথল্যাবে একটি ধমনিতে রক্ত প্রবাহ ফিরে এলে চিকিৎসক চিকিৎসার অগ্রগতি দেখতে পান। বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবার সেই অগ্রগতির মধ্যে দেখে অন্য কিছু—বাবার সঙ্গে আবার কথা বলা, মায়ের পাশে বসে খাওয়া, জীবনসঙ্গীর হাত ধরে ঘরে ফেরা।
প্রতিটি রোগীর পেছনে এমন একটি পৃথিবী থাকে। থাকে অপেক্ষমাণ মানুষ, অসমাপ্ত দায়িত্ব এবং আগামী দিনের ছোট ছোট স্বপ্ন। সময় মতো চিকিৎসা সেই পৃথিবীটিকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ বাড়ায়।
নীরব হৃদ্ঝুঁকি চিনুন। সতর্ক সংকেতে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। প্রতিরোধ থেকে পুনর্বাসন পর্যন্ত সবার জন্য কার্যকর হৃদসেবা নিশ্চিত করুন। সময় বাঁচান, জীবন বাঁচান—যেন আরও একটি পরিবারের দরজায় প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার শব্দ শোনা যায়।
লেখক: এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)
ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ; পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
