মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৪১২, নমুনা সংগ্রহ ৭২ জনের

ফন্ট সাইজ:

এক বা দুই বছর নয়, এক দশকের বেশি সময় ধরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ চলছে মেহেরপুরের গাংনীতে। কখনো আক্রান্ত্তের সংখ্যা কমেছে, আবার কখনো তা বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৯৩ জন, পরের বছর ৬৮৬ জন। রোববার সকাল পর্যন্ত চলতি বছরে আক্রান্ত্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১২ জনে। বছরের শেষ তিনমাস বাকি থাকতেই চার শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় রোগটির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে গাংনীতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের ধরন, জীবাণুর বৈশিষ্ট্য ও দ্রুত শনাক্তের পদ্ধতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্র্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। আক্রান্ত রোগীদের রক্ত ও ক্ষত থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত ৭২ জন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ টিম। পাশাপাশি ২০০টি নমুনা সংগ্রহ করে অ্যানথ্রাক্স শনাক্তে র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টুল (আরডিটি) নিয়ে সার্ভেও চালানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অনুসন্ধানের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশে বিদ্যমান তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্সের মধ্যে গাংনীতে কোন ধরনের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে, তা নির্ণয় করা। সেই তথ্যের ভিত্তিতে রোগীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্র্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আইইডিসিআরের টিমটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. আরিফ। তার সঙ্গে রয়েছেন টেকনিশিয়ান আব্দুল গাফফারসহ আরও দুই সদস্য। তবে গাংনীতে কাজ করা তিন সদস্যকে জরুরিভিত্তিতে গাইবান্ধায় পাঠানো হয়েছে। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, সেখানে ৪-৫ দিনের কাজ শেষ করে তারা আবার মেহেরপুরে ফিরবেন।

তবে আইইডিসিআরের এই অনুসন্ধানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত্তের সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। ২০১৪ সালে ২০৩, ২০১৫ সালে ১৫৪, ২০১৬ সালে ২৪০, ২০১৭ সালে ২৮১, ২০১৮ সালে ৪০৮, ২০১৯ সালে ৬৬০, ২০২০ সালে ৩৭৮, ২০২১ সালে ৪১৭, ২০২২ সালে ৬৪৪, ২০২৩ সালে ৭৯৩ এবং ২০২৪ সালে ৬৮৬ জন আক্রান্ত হন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত ছিলেন আরও ৬৩৭ জন। অর্থাৎ বছরের পর বছর আক্রান্তের সংখ্যা ওঠানামা করলেও গাংনী থেকে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি; বরং কয়েকটি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছয় থেকে সাতশ’ ছাড়িয়েছে। এবারো সেপ্টেম্বরেই আক্রান্ত্তের সংখ্যা চার শতাধিক। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক পর্যেবক্ষণ বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ রোগাক্রান্ত গরু-ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে গবাদিপশুতে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি, আক্রান্ত পশু জবাই এবং সেই পশুর মাংস বা দেহজাত পদার্থ মানুষের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে।

মেহেরপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. ইনজামাম উল হক বলেন, অ্যানথ্রাক্স মূলত তিন ধরনের হলেও মেহেরপুর জেলায় বর্তমানে শুধু কিউটেনিয়াস বা ত্বকের অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণই দেখা যাচ্ছে। এটি কিছুটা স্বস্তির বিষয়। নিকট অতীতে মেহেরপুরে আক্রান্ত রোগীদের কারও ফুসফুস বা অন্ত্রনালিতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্স হয়ে থাকে।
এর মধ্যে এ এলাকায় কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। সমন্বিত কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের জানানো এবং আক্রান্ত পশুর মাংস স্পর্শ ও নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকতে গবাদিপশু পালনকারীদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।