শতাধিক ব্যক্তিকে গুমের অভিযোগে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচারিক কার্যক্রম আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে সমাপ্ত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি জানান, মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিপার্শ্বিক যে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে প্রসিকিউশনের মনে হয়েছে যে, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রসিকিউশনের প্রত্যাশাÑআসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, মেজর (অব.) সাব্বিরের জেরার মধ্যদিয়ে আমাদের ন্যাচারাল বা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এরপর পিডব্লিউ-১৪ হিসেবে একজন সিজার উইটনেস শামীমুল ইসলাম সাক্ষ্য দিয়েছেন। পরবর্তী ধার্য তারিখে মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সাক্ষ্য দেবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১০৪ জন ভিকটিমকে ন্যায়বিচার এনে দিতে রাষ্ট্র সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। আলকাছ মল্লিক নামের একজন মাঝির অপহরণের ঘটনা ছাড়া বাকি প্রতিটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব সাক্ষীর মধ্যে অভিযুক্তের তৎকালীন বাহিনী প্রধান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (জিওসি) এবং অধস্তন কর্মকর্তারা রয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য শেষে আসামিপক্ষ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সাফাই সাক্ষী (ডিডব্লিউ) দিতে পারবে। এ বিষয়ে তারা দুজন সাক্ষীর একটি প্রাথমিক তালিকাও দিয়েছে।
বিচার শেষের সময়সীমা প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর বলেন, রায় কবে হবে তা নির্ধারণের এখতিয়ার সম্পূর্ণ আদালতের। তবে সবকিছু স্বাভাবিক গতিতে চললে আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই উভয় পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) শেষ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মেজর সাব্বিরের জেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জবানবন্দিতে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অক্ষত রয়েছে। আসামিপক্ষ সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করার চেষ্টা করলেও তাতে সফল হয়নি। কোনো অপরাধের দায় অন্যের ওপর চাপাতে চাইলে তা প্রমাণের দায়িত্ব আসামিপক্ষের ওপরই বর্তায়।
অন্যান্য গুমের মামলার বিষয়ে তিনি জানান, কোনো মামলাই থেমে নেই। আইও সাক্ষ্য পর্যায়ে থাকায় কয়েকটি মামলা একই সঙ্গে যুক্তিতর্কের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিচারিক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক নিয়মেই এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এদিকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ চট্টগ্রামে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা একটি মামলার চার্জ গঠনের শুনানি প্রসঙ্গে মিজানুল ইসলাম জানান, ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারক (মেম্বার-১) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে সিএমএইচে ভর্তি থাকায় চার্জ শুনানি মুলতবি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় বিচারকের অনুপস্থিতিতে শুনানি না করার সিদ্ধান্তকে প্রসিকিউশনও সমর্থন জানিয়েছে।
এদিকে, গতকাল ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আসামি জিয়াউল আহসানের পক্ষে তার আইনজীবী এডভোকেট মো. সাহিদুর রহমান সাক্ষীকে বিস্তারিত জেরা করেন। জেরায় সাব্বির জানান, পূর্ববর্তী জবানবন্দি অনুযায়ীÑকটকা, মরা ভোলা ও নিশানখালীর এনকাউন্টারগুলো ছিল মূলত ‘সাজানো’। অভিযানের আগেই ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দল ঘটনাস্থলে যেত এবং সেখানে সাধারণ বনদস্যুদের দেশি বন্দুকের বদলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার হতো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতেন। জেরায় আসামিপক্ষ এসব তথ্য অসত্য বলে দাবি করলেও সাক্ষী তা অস্বীকার করেন। এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের মাথায় যমটুপি ও হাত বেঁধে ট্রলারের খোলে তোলা, মাথায় গুলি করে এবং সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে লাশ ফেলে দেয়ার যে বিবরণ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া হয়েছিল, সাক্ষী জানান, বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে প্রায় ১৫/২০ বার এ ধরনের অপারেশন চালানো হয়েছিল। তথ্য ফাঁস করে দেয়ার সন্দেহে ট্রলারের মাঝি আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ করতে জিয়াউল আহসান নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। সাক্ষী সেই নির্দেশ এড়িয়ে যাওয়ার কিছুদিন পরই আলকাছ নিখোঁজ হন। জেরায় আসামিপক্ষের অসত্যের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। অভিযানের বিবরণ ও লিমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১২ সালে কটকা অভিযানে তিনটি ট্রলারে করে অভিযান পরিচালনা এবং মরা ভোলা অভিযানে র্যাবের নিজস্ব হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়টি সাক্ষী নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া কর্মকালীন সময়ে ঝালকাঠিতে কলেজছাত্র লিমনকে র্যাব সদস্যরা গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনা তিনি শুনেছিলেন বলে আদালতকে জানান। যদিও জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন সাক্ষী জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অসত্য সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তবে সাক্ষী তা অস্বীকার করেন।
