প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনটিকে ‘নিবর্তনমূলক’ এবং মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেছেন বক্তারা। এটি করার আগে বেশ কিছু সংস্কারের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
গতকাল ডেইলি স্টার সেন্টারে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এমন মত দেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন- প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। বিজেসি’র চেয়ারম্যান ও যমুনা টিভি’র সিইও ফাহিম আহমেদের সভাপতিত্বে আলোচনা করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, নিউজ পেপার্স ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)- এর সভাপতি ও মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, সিনিয়র আইনজীবী ও ‘ব্লাস্ট’ এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলসহ বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি আয়োজনে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিজেসি’র অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনটির নির্বাহী মিল্টন আনোয়ার। বলা হয়, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা সংশোধনী নিয়ে মূল শঙ্কা, নতুন যুক্ত হওয়া ২৬ক ধারায় ‘গুজব ও অপতথ্য’র অস্পষ্ট সংজ্ঞায় ‘অযাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ’কে ১০ বছরের দণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে, যা জরুরি সময়ে সাংবাদিকতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। আবার নারী ও শিশু সুরক্ষার মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে ২৫ ধারায় ‘মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন’ জুড়ে দেয়ায় এটিরও সমালোচনা দমনের হাতিয়ার হতে পারে। এ ছাড়া কারণ না জানিয়ে কন্টেন্ট ব্লগ, গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের বিধান এবং কাউন্সিলে গণমাধ্যমের প্রতিনিধি না রাখাকেও উদ্বেগজনক মনে করে বিজেসি। তাই ধারা ২৬ক পুনর্বিবেচনা, ধারা ২৫ থেকে মানহানি বাদ, কন্টেন্ট ব্লগ করতে হলে তার স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ এবং আইন চূড়ান্তের আগে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে মুক্ত আলোচনা নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংগঠনটি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য , পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এই আইন পরিবর্তন ও সংশোধনের সুযোগ আছে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার আগামীতেও দায়িত্ব পালনের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে, তাই তারা কোনোভাবেই আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার ঝুঁকি নেবে না। তিনি বলেন, ডিজিটাল মাধ্যম ও সম্প্রচারের ব্যাপকতার কারণে অতীতের যেকোনো ?সময়ের তুলনায় মানহানির প্রবণতা ও প্রভাব দু’টোই অনেক বেশি
ডা. জাহেদ উর রহমান আশা প্রকাশ করেন, বর্তমানে যেমন অংশীজনরা স্বাধীনভাবে আইনটি নিয়ে আলোচনা করতে পারছেন, তেমনি ভবিষ্যতে যদি কখনো এই আইনের অপপ্রয়োগ হয় তাহলে সেটিও অংশীজনরা তুলে ধরবেন।
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি)’র সদস্য সচিব ইলিয়াস হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি প্রস্তাবিত এই আইনটিকে একটি ‘জঘন্য আইন’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এমনিতেই এখন ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ এতটা বেশি যে সেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ খুবই সংকুচিত। তার ওপর যদি এ ধরনের সংশোধনী চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, আইন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেটা বাকস্বাধীনতা নষ্ট করে নয়। অপতথ্য রোধে যদি আইন করতেই হয় তাহলে এমনভাবে করতে হবে যেন সাইবার অপরাধ কমে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনা, ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা, গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি ইত্যাদি বিষয়গুলোর কারণে অতীতের ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ এর মতোই প্রস্তাবিত আইনটি হয়রানির জন্য ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের আইন প্রণয়নের আগে অংশীজনদের পাশাপাশি অতীতে এসব আইনের কারণে যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন সেইসব ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলা উচিত।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান তার বক্তব্যে প্রস্তাবিত আইনটির অনেকগুলো ধাপেই অপপ্রয়োগের ঝুঁকির কথা বলেন। এ ছাড়া তিনি সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিও জোর দেন।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন সোহেল বলেন, আজকের এই সময়ে এসেও যে প্রস্তাবিত এই আইন নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে সেটি ‘অযৌক্তিক’। আইনটি যেন এমন না হয় যে, একজন ম্যাজিস্ট্রেট চাইলেই গ্রেপ্তার করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের আইন ও তার অপপ্রয়োগ হলে গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য আন্দোলন বিফলে যাবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, অপতথ্য মোকাবিলায় আইনের প্রয়োজন থাকলেও এটি নিয়ে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ভেতর থেকে যদি গুণগত পরিবর্তন না আসে তাহলে আইন করে কিছু হবে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার প্রিয়া চৌধুরী অতীতে যেসব দেশে এ ধরনের আইন করা হয়েছিল তারা অনেকেই সেই আইন থেকে সরে এসেছে বলে উল্লেখ করেন।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, আইনের অস্পষ্টতা থাকলে অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও এটির সীমা বুঝতে পারেন না এবং কারও কারও অতিউৎসাহের কারণে সংশ্লিষ্টরা আরও বেশি হয়রানির শিকার হন।
অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আলোচনায় আরও অংশ নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাব-এর অধ্যাপক সুমন রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাহাত মিনহাজ, বিজেসি’র ট্রাস্টি নূর সাফা জুলহাস ও বিজেসি’র নির্বাহী সদস্য পারভেজ রেজা, শাহনাজ শারমিন, সমষ্টি’র নির্বাহী পরিচালক মীর মাশরুর জামান প্রমুখ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ব্লাস্ট-এর ফেলো নওশীন ফেরদৌস সামান্থা আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে যেয়ে ঢাকা ও রাঙ্গামাটির সাংবাদিকরা যেসব আইনি বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন সে বিষয়ক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন।
