প্রাথমিকে বাদ পড়াদের ক্ষোভ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে সরকার

ফন্ট সাইজ:

বন্যা মল্লিক, ফার্মেসিতে অনার্স-মাস্টার্স। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় খুলনার পাইকগাছা উপজেলার মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হয়েছেন। তিনি বলেন, আমার কাগজে কোনো সমস্যা নাই। পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না, কারও নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, স্থায়ী ঠিকানা/জমিজমা নিয়েও কোনো সমস্যা নেই। আমার নিয়োগপত্র আসেনি। রাষ্ট্র মনে করেছে আমি প্রাইমারিতে চাকরি করার যোগ্য না। তিনি বলেন, আমি বাদ পড়েছি মেনে নিলাম। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরে কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে কোনো বাদ পড়লাম তা শুধু জানতে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন আব্দুল কাইয়ুম। সরকারি প্রাথমিকে সকল ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরও হাতে পাননি নিয়োগপত্র। তিনি বলেন, কোনো কারণ জানি না। আমার কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নাই। কোনো মামলা নাই। মেধার মাধ্যমে চাকরি হয়েছে। তাহলে কেন আমাকে ভেরিফিকেশনে আটকে দেয়া হলো?

এই দুই প্রার্থীর মতো নিয়োগপত্র পাননি শত শত প্রার্থী। নির্দিষ্ট সংখ্যা না জানা গেলেও প্রার্থীদের হিসাব অনুযায়ী তা দেড় হাজারের বেশি। ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ ব্যাচ’ বলছে এই সংখ্যা ২৫০০’র অধিক। বঞ্চিতরা কেন নিয়োগপত্র পাননি তা তারা জানেন না। বিভিন্ন অফিসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সদুত্তর পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, এক অফিস দায় চাপাচ্ছে আরেক অফিসের উপর। ভেরিফিকেশন নিয়ে এই সমস্যার কারণে ক’দিন ধরেই চলছে সমালোচনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও করেছেন সমালোচনা। দেয়া হয়েছে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর জানানো হয়, বাদপড়া প্রার্থীদের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

বন্যা মল্লিক, আব্দুল কাইয়ুমের মতো হাজারো নিয়োগপ্রত্যাশী হতাশায় সময় পার করছেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের রাহুল দাস। দীর্ঘদিন বেকার থাকার পর চাকরি হওয়ায় মা’কে ‘প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে’ বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তবে নিয়োগপত্র বিতরণের সময় ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েন রাহুল। নিয়োগপত্র না পাওয়ার খবর মা’কে এখনো জানাতে পারেননি বলে ফেসবুকে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত ৮৩ জনের মধ্যে মেধাক্রমে ৫৪তম ছিলেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মো. জাহিদ হাসান। মেধাতালিকায় জায়গা পেলেও ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগপত্র পাননি তিনি। জাহিদের দাবি, তার কোনো রাজনৈতিক পদ নেই এবং তার বিরুদ্ধে কোনো মামলাও নেই। নিয়োগ না পাওয়ার খবর শুনে তার মা কান্না করছেন এবং বাবা স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন বলে জানান তিনি। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তামান্না আক্তার। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার মেধাতালিকায় প্রথম এবং পুরো জেলায় ১১তম হয়েছিলেন তিনি। তবে নিয়োগপত্র পাননি।

তামান্নার দাবি, পুলিশ বা এনএসআই ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং তার বা পরিবারের কারও কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই।
নিয়োগবঞ্চিতরা হতাশা প্রকাশের পাশাপাশি দিয়েছেন আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এ চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া যোগ্য প্রার্থীদের রোববারের মধ্যে নিয়োগপত্র দেয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রার্থীরা। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। শনিবার ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ ব্যাচ’-এর পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। এতে বলা হয়, দীর্ঘ আট মাস সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বেকার থেকে মানবেতর জীবনযাপন করার পর যখন অযাচিতভাবে একজন প্রার্থী ভেরিফিকেশনের নামে প্রহসনে নিয়োগপত্র বঞ্চিত হয়- তখন রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার স্পষ্টভাবে হরণ করা হয়।

সরকারি প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এনএসআই, এসবি ও ডিএসবি’র ভেরিফিকেশনের নামে বিভিন্ন জেলায় শত শত প্রার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ দেয়ার অভিযোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)।

শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে ইউটিএলের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. যুবাঈর মুহাম্মদ এহসান বলেন, বাদ পড়া প্রার্থীরা প্রত্যেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার ভিত্তিতে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ভেরিফিকেশনের নামে তাদের বাদ দেয়া হয়ে থাকলে এর সুনির্দিষ্ট কারণ ও আইনগত ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। তারা বলেন, ভেরিফিকেশন কখনোই রাজনৈতিক-মতাদর্শিক বৈষম্য, হয়রানি বা বাছাইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে না। ইউটিএল নেতারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে কারও রাজনৈতিক মতামত, ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে চাকরিবঞ্চিত করার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নির্দিষ্ট অপরাধ বা আইনগত অযোগ্যতার প্রমাণ ছাড়া নিছক অনুমান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতপার্থক্যের ভিত্তিতে কাউকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিগত ১৭ বছর গোপন প্রতিবেদনের নামে রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা করে নাগরিকের চাকরি ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়া হয়েছে যা আর চলতে পারে না।

নানাবিধ সমালোচনার মুখে বিবৃতি দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। শনিবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বৈঠক শেষে মন্ত্রীর বরাতে জানানো হয়, ১লা অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেলে তা পরবর্তীতে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন/ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।

উল্লেখ্য, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল গত ৯ই জানুয়ারি। পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন। পরে ৮ই ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়।