সচিব পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রতারক চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো উত্তর। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মো. সাহাবুদ্দিন হাওলাদার খলিলুর রহমান (ছদ্মনাম মিজানুর রহমান), সুমন আহমেদ (ছদ্মনাম জাহাঙ্গীর আলম) ও মো. জাহাঙ্গীর আলম শাহীন (ছদ্মনাম সাইফুল)। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফারুক হোসেন জমির শেয়ার বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপন দেখে চক্রের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম শাহীন (ছদ্মনাম সাইফুল) তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজেকে জমির মধ্যস্থতাকারী পরিচয় দিয়ে একজন সচিবের কাছে জমি বিক্রির ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৭ই ডিসেম্বর ফারুক হোসেনকে ধানমন্ডিতে নিয়ে একটি অভিজাত বাসভবন থেকে দামি গাড়িতে বের হওয়া সাহাবুদ্দিন হাওলাদারকে ‘সচিব’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। ওই ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি সচিব হওয়ায় সরাসরি জমি কেনায় কিছু সমস্যা রয়েছে। পরে তিনি ভুক্তভোগীর জমির পাশাপাশি সাভারের বিলামালিয়া মৌজার ৫৮ শতাংশ জমি কিনে দেয়ার প্রস্তাব দেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত সচিবের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর সামনেই মধ্যস্থতাকারীকে এক লাখ টাকা অগ্রিম দেয়ার নাটক করা হয়। এরপর সাইফুল ভুক্তভোগীকে বোঝান, সাভারের ওই জমির মালিক তার পরিচিত এবং জমিটি কথিত সচিবের কাছে বিক্রি করে দিলে তিনি ১ কোটি টাকা লাভ করতে পারবেন। এরপর চক্রের সদস্যরা ভুক্তভোগীকে বিশ্বাস করাতে বিভিন্ন নাটক সাজায়। কথিত জমির মালিককে ফোন করে তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। ওই ব্যক্তি তার শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় ডেল্টা হাসপাতালের সামনে দেখা করার কথা জানান। সেখানে ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।
এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, পরে ৫৮ শতাংশ জমির দাম ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। কথিত সচিবের কাছে জমি বিক্রি করে ১ কোটি টাকা লাভের আশায় ভুক্তভোগী ১০ লাখ টাকা বায়না দিতে রাজি হন। ব্যাংক ও বাসা থেকে টাকা সংগ্রহ করে তিনি কথিত জমির মালিকের কাছে ওই ১০ লাখ টাকা দেন। পরে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বায়নানামা করার নাটক করে ভুক্তভোগীর স্বাক্ষর নেয়া হয় এবং এর একটি ফটোকপি দেয়া হয়। কিন্তু বায়নাপত্রের মূল কপি দেয়ার কথা বলে আবারো তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে তিনি আরও ২০ লাখ টাকা দেন। এভাবে মোট ৩০ লাখ টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা তাকে জমির বায়নাপত্র না দিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন।
পিবিআই জানায়, প্রতারণার অংশ হিসেবে চক্রটি বিভিন্ন সময় ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন অজুহাত দেখাতো। কখনো কথিত সচিবের অফিসে যাওয়ার কথা, কখনো ভাড়া বাসায় যাওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হতো। এমনকি কথিত জমির মালিকের অসুস্থতা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার গল্পও সাজানো হয়। ভুক্তভোগীকে বিশ্বাস করানোর জন্য ভুয়া স্ট্যাম্প ও ভুয়া উকিলের প্রসঙ্গও ব্যবহার করা হয়।
পরে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগী পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নানের নেতৃত্বে উপপরিদর্শক উজ্জ্বল ঘোষসহ একটি দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গত ২৭শে আগস্ট দারুস সালাম থানায় ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় মামলা করেন। জনগুরুত্ব বিবেচনায় মামলাটি পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর স্ব-উদ্যোগে তদন্তের জন্য গ্রহণ করে। তদন্তে দারুস সালাম, পল্লবী, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে কথিত জমির মালিক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহআলী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে কথিত জমির দালাল জাহাঙ্গীর আলম শাহীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কথিত সচিব সাহাবুদ্দিন হাওলাদারকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তারা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রতারণা এবং আত্মসাৎ করা ৩০ লাখ টাকা ভাগ করে নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতারণার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল পরিকল্পিত। কথিত সচিবের গলায় মোটা স্বর্ণের চেইন, চোখে কালো চশমা ও দামি গাড়ি ব্যবহার করা হয়। ধানমন্ডির একটি অভিজাত বাড়িকে তার বাসা হিসেবে দেখানোর জন্য নানা কৌশল নেয়া হয়। একইভাবে কথিত জমির মালিকও নিজের বাসার ঠিকানা না দিয়ে অসুস্থ শাশুড়ির কথা বলে ডেল্টা হাসপাতালের সামনে সাক্ষাতের নাটক করেন। এ ঘটনায় পিবিআই একটি ভুয়া বায়নাপত্রের স্ট্যাম্প, প্রতারণায় ব্যবহৃত কথোপকথনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) এবং সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করেছে।
পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে জমি বা অন্য কোনো সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়, টাকা লেনদেন, মোবাইল ও অনলাইনে যোগাযোগ এবং কর্মী বা ব্যবসায়িক স্টাফ নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
